জীবনের কানাগলি

 

স্বস্তির কাছ থেকে তার ঠিকানা যখন শুনেছিল তখন অতোটা আগ্রহ ছিল না জীবনের। কারণ সস্তি তো তখন সাথেই ছিল, হাত বাড়ালেই পাওয়া যেত, তাই হারানোর কোন শঙ্কা ছিল না। স্বস্তি চলে যাওয়ার পর জীবন ওকে নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে শুরু করলো আর তখন থেকেই ওর জন্য অভাববোধ করতে লাগলো।
এমনিই হয়। অভাব বোধটা বোধহয় এরকমই। কোন কিছু থাকলে তার জন্য অভাব বোধ হয় না। না থাকলে সে বোধটা জন্মায়।

ঠিকানাটা মনে না করতে পেরে বন্ধুদের কাছ থেকে নতুন করে শুনেছে স্বস্তির ঠিকানা, আর সে ভাবেই স্বস্তির খোঁজে যাত্রা শুরু জীবনের।

স্বস্তির সাথে জীবনের পরিচয় মোটামুটি বলতে গেলে কলেজ জীবনের শুরু থেকে। যে বয়সে মানুষ স্বপ্নের খোলস থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে বাস্তবতা বুঝতে শুরু করে। সোজা করে বলতে গেলে বলতে হয় সে বয়সে একজন যুবক বা যুবতি বুঝতে পারে লেখাপড়া শেখাটা বাবা মা বা মাষ্টার সাহেবের জন্য নয় এটা তার নিজের জন্য।
ইতিপূর্বে স্বস্তির মত দু একজনের দেখা মিলেছে জীবনের কিন্তু তখন সেটা দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, মনের গন্ডি পেরিয়ে সে ভাবনা অন্তরে ঢুকতে পারিনি। অনেকটা চলন্ত ট্রেনের স্বচ্ছ কাচের জানালা দিয়ে দূরে ছায়া ঢাকা মায়া মাখা গ্রাম দেখার মত। দেখাতেই সুখ, ট্রেন থেকে নেমে সেখানে যাওয়াতে নয়।
ছোট কালে বাবার কাছ থেকে কোন কিছু চেয়ে না পাওয়ার মধ্যে একটা কষ্ট অনুভূত হত ঠিকই কিন্তু খেলাধুলাই মেতে উঠলে সে কষ্টটা মন থেকে মিলিয়ে যেত। অর্থাৎ সে বয়সে মনের দুয়ার পার হয়ে কোন কিছু হৃদয়ের কুঠরিতে প্রবেশ করতো না।
সোনালী সে দিন গুলো পার করে কলেজে উঠে ক্লাসের প্রথম দিন সামনের বেঞ্চে বসা একটা মেয়ে জীবনের নজর কাড়ল। তাকে জানে না চেনে না আগে কখনো দেখেনি, তবু মনে হল কত দিনের চেনা, ওর সাথে ভাব করতে পারলে জীবনটা সার্থক হবে। এমনটি ইতিপূর্বে ঘটেছে কিনা মনে পড়ে না জীবনের।
স্বস্তি ওর নাম। নামটা ওকে জিজ্ঞেস করে বা অন্য কারো কাছ থেকে জানেনি জীবন। ওকে পেলে বা ওর সাথে বন্ধুত্ব করতে পারলে জীবনটা শান্তিতে ভরে যাবে সে চিন্তা থেকে ও নিজেই মনে মনে মেয়েটাকে ওই নামটা দিয়েছে।
স্বস্তি ক্লাসে উপস্থিত থাকলে মনে হত ওর পৃথিবীটা আনন্দে ডগমগ করছে। সেদিন ক্লাসগুলো যেন তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যেত। ওর উপস্থিতিটাই জীবনের মনকে তৃপ্তিতে ভরে রাখতো। তাতে ক্লাস করেও যেমন আনন্দ পেত তেমনি পড়াশোনাইও অধিকতর মনোযোগী হয়ে উঠত জীবন।

হটাৎ করে একদিন স্বস্তি ক্লাসে আসলো না। জীবনের মন থেকে আনন্দ যেন উধাও হয়ে গেল। জীবন নিজের মনকে বুঝানোর জন্য ভাবল –হয়তো ওর শরীর খারাপ বা অন্য কিছু, কাল নিশ্চয় আসবে।
কিন্তু পরের দিন, তার পর দিনও সে না আসাতে অস্বস্তিতে ভুগতে লাগলো জীবন। ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখতে পারল না। ক্লাসের সময় টুকু যেন অনেক ভারী হয়ে উঠলো, সময় যেন কাটতেই চায় না। ক্লাসে কিছুতেই মন বসাতে পারলো না।
কি করবে জীবন, কাউকে কিছু বলতেও পারে না। মনের অস্বস্তিতে একবার ভাবল এ কলেজ ছেড়ে দেবে, এমনকি পড়াশোনা বন্দ করে দেয়ার কথাও ভাবল।
যাহোক, অপেক্ষার পালা শেষ করে সপ্তাহ খানেক পর স্বস্তি ফিরে আসলো। সব ভুলে জীবনের মনটা আবার চাঙ্গা হয়ে উঠলো। সে আবার পড়াশোনাই মন বসালো।

হাফ ইয়ারলি পরীক্ষাই ফার্স্ট হল জীবন, প্রিন্সিপ্যাল সহ অন্যান্য শিক্ষকরা ওকে খুব প্রশংসা করলেন। বন্ধুরা সবায় ওকে অভিনন্দন জানালো।
স্বস্তি জীবনের দিকে তাকিয়ে হাসল।
-ওটাই হয়তো ওর অভিনন্দন জানানোর ভাষা। ভাবল জীবন।
ক্লাসের বন্ধুরা ওকে একটা পার্টির আয়োজন করে এটা সেলিব্রেট করার অনুরোধ করল। সানন্দে রাজী হল জীবন।
জীবনের বাবা বড় ব্যবসায়ী। তাকে বলে জীবন শহরের নামকরা রেস্টুরেন্টে পার্টির ব্যাবস্থা করল।
পার্টির দিন বারবার ওর মনে হতে লাগলো স্বস্তি আসবে তো ওর পার্টিতে!
যাহোক, সবার সাথে স্বস্তিও আসলো। মিষ্টি হেসে জীবনকে একটা লাল গোলাপ উপহার দিয়ে অভিনন্দন জানালো। পার্টি শেষে অন্যান্য বন্ধুদের সাথে তাল মিলিয়ে স্বস্তিও জীবনের প্রশংসাই পঞ্চমুখ হয়ে উঠলো।
জীবনের আনন্দটা কানাই কানাই পূর্ণ হল। জীবনটা সার্থক মনে হল।
এর পর থেকে স্বস্তির সাথে বেশ মধুর একটা সম্পর্কের ভিতর দিয়ে পড়াশোনা চলতে লাগলো জীবন। ওর পড়াশোনা আর রেজাল্টও ক্রমে ক্রমে আরো ভাল হতে লাগলো।

সামনে গ্রাজুয়েসান পরীক্ষা। জীবনকে নিয়ে ক্লাসের বন্ধু আর টিচারদের সবার অনেক প্রত্যাশা -জীবন খুব ভাল রেজাল্ট করে এবার কলেজের মুখ উজ্জ্বল করবে।
জীবন সব কিছু ভুলে পড়াশোনাই মনোনিবেশ করলো। ব্যস্ততা জীবনকে পুরোপুরি গিলে ফেলল। ও নিজেকে একটু একটু করে সব কিছু থেকে গুটিয়ে নিল। বন্ধুদের সাথেও মেলামেশাও প্রায় বন্দই করে দিল।
এমনি সময় একদিন ওর এক বন্ধু স্বস্তির কোন একটা পারিবারিক দুর্ঘটনার কারণে ওকে কলেজ ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে বলে জানালো। বন্ধুটি আরো জানালো যে যাওয়ার আগে স্বস্তি একদিন কলেজে এসেছিল সবার কাছ থেকে বিদায় নিতে।
জীবন তখন ওর পড়াশোনা আর ভাল রেজাল্ট করার চিন্তায় এতই নিমগ্ন ছিল যে স্বস্তির চলে যাওয়াটা ওর মনে তেমন কোন বাড়তি আগ্রহের সৃষ্টি করতে পারলো না।
পরীক্ষা হল সময় মত। জীবন পরীক্ষাই ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হল। ওকে নিয়ে ওর কলেজের সবাই সহ বন্ধু আত্মীয়রা উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। জীবনের বাবা বড় আয়োজন করে পার্টির ব্যাবস্থা করলেন। মন্ত্রী সহ শহরের সব গন্য মান্য ব্যক্তিবর্গ ওকে অভিনন্দন জানালো। ফুলের মালায় ভরে গেল ওর গলা। এতবড় একটা উপার্জনে নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করার সময় জীবন গুরুজনদের মত করে কলেজের ছাত্র ছাত্রীদের উদ্দেশে নানা উপদেশমূলক বক্তব্যও রাখল।
এই রেশ কাটতে কাটতে কয়েক মাস চলে গেল। এই আনন্দের ভিড়ে একবারও স্বস্তির কথা একদম মনে পড়লো না জীবনের।
এমনিই বোধহয় হয়। মানুষের মন বড় বিচিত্র, জীবনের তাৎক্ষনিক কোন ব্যস্ততা; আনন্দ বা বিষাদকে প্রাধান্য দিয়ে মানুষ সাময়িক ভাবে অন্য সব ভুলে থাকতে পারে। জীবনে আনন্দ বা বেদনার আতিশয্য মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে সংকীর্ণ করে দিয়ে মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক করে দেয়। এটা একটা ভ্রম বটে, যাকে অনেকটা স্বার্থপরতাও বলা যায়।
সাফল্যের ডামাডোল স্তিমিত হয়ে আসলে জীবন যখন তার সুখবোধের আবেশ থেকে বের হল, তখন ওর মনে আবার সেই অশান্তির ভাবটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো। মনে পড়ল স্বস্তির কথা। তাকে ছাড়া জীবনটা অনর্থক মনে হল। আর তাইতো স্বস্তির খোঁজে তার এই যাত্রা।

কিন্তু পথের এই কানাগলিতে ঠেকে এখন কি করবে জীবন!

চলতি পথে কখনো দুই কখনো তিন বা ততোধিক রাস্তার মোড় এসে সামনে দাড়িয়েছে জীবনের। যখনি এমন সন্ধিক্ষণ এসেছে তখন একটু থেমে স্বস্তির দেয়া বা বন্ধুদের দেয়া স্বস্তির ঠিকানার বর্ণনা অনুযায়ী মিলিয়ে পথটা ঠিক করে নিয়েছে।
চলতে পথে কত রাত দিন, বর্ষা রোদ, সমতল বা পাহাড়ি জংলী বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়েছে তার হিসেব নেই। অনেকবারই রাস্তাটা অদ্ভুত একেকটা কানাগলিতে ঠেকেছে, মনে হয়েছে এই বোধহয় শেষ। কিন্তু সাহস না হারিয়ে শেষ মাথা অব্দি গিয়ে দেখেছে ওটা শেষ নয়, নতুন করে শুরু অর্থাৎ শার্প বাঁক।
সে যাই হোক, গন্তব্যের খোঁজে যতক্ষণ কেউ সামনে এগুতে থাকে, কষ্ট হলেও ততোক্ষণ কোন দুশ্চিন্তা থাকে না, কারণ গন্তব্যের দিকে অগ্রসরের মধ্যে অর্জনের একটা গন্ধ আছে, সে যত দূরের রাস্তাই হোক না কেন।
কিন্তু এবারে রাস্তাটা এসে সত্যি সত্যিই যেন কানা গলিতে ঠেকল।
প্রশস্ত মসৃণ রাস্তা সেটা ধরে অন্যমনস্ক হয়ে হাটতে হাটতে একটা জনশূন্য জায়গায় এসে জীবনের অজান্তেই রাস্তাটা ফুরিয়ে গেল।
চারদিকে কেউ নেই, কিচ্ছু নেই। সামনে ধূধূ বালুচর, দূরে মনে হয় নদী, কিন্তু এই প্রখর রোদ্রে সেটা মরিচিকা বলে বলে ভুল হতে পারে। ডানে বায়েও বালু আর বালু।
অনেক এবড়ো থেবড়ো রাস্তা আর দোমাথা, তেমাথা পার হওয়ার পর এই সোজা মসৃণ রাস্তাটা পেয়ে জীবন মনে করেছিল এটাই তাকে স্বস্তির ঠিকানায় নিশ্চিত পৌঁছে দেবে।
এবড়ো থেবড়ো রাস্তায় চলার মধ্যে একটা সুবিধা আছে, অন্যমনস্ক হওয়ার ফুসরত পাওয়া যায় না। বন্ধুর পথে ভাল খারাপের ডামাডোলে মন হারিয়ে যেতে পারে না। সব সময় বর্তমানে সজাগ থেকে না পাওয়া গন্তব্যকে খুঁজতে থাকে।
বেশী সোজা মসৃণ নিশ্চিত গন্তব্যে গময়ামন রাস্তায় চলার এই এক বিড়ম্বনা। এ ধরনের চলাতে পথ সম্পর্কে মনের ভিতর আত্মবিশ্বাসটা মাত্রা ছাড়িয়ে মনকে অতি বিশ্বাসী করে বর্তমানকে ভুলে মন অতীত বা ভবিষ্যতে ডুব দেয়। এবড়ো থেবড়ো পথে চলা অভ্যস্ত চালক হটাৎ করে মসৃণ পথে ড্রাইভ করতে শুরু করলে চলার একঘেয়েমি চোখে দুটো ঘুমে বন্দ হয়ে আসার মত ব্যাপার অনেকটা।
মসৃণ রাস্তাটা এই বালিয়াড়ির মধ্যে প্রবেশ করার আগে ডানে বায়ে ছোট বড় পথ নিশ্চয় গন্তব্যে নেমে গিয়েছে, এত মসৃণ পথে চলা অনভ্যস্ত জীবন যেটা খেয়াল করেনি।
কি করবে এখন সে! মনটা অস্তিতে ভরে গেল।
-স্বস্তি কি ওই দূর বালিয়াড়ির রাজ্যে চিক চিক করা মরীচিকার মধ্যে লুকিয়ে আছে কোথাও!
ভাবল জীবন।

Category: Bangla, Short Story

Comment List

Your email address will not be published.

  • เข้ามาสมัครเล่นเกม พนันออนไลน์ apollo pg เกมพนันออนไลน์ Apollo Slot Pg ที่สามารถช่วย ให้ผู้เล่นได้รับ ทั้งยังความเพลิดเพลิน ความระทึกใจ และก็โอกาศ ที่จะสร้างรายได้

  • texas slot เกมสล็อตออนไลน์แบบเกมที่ล้ำยุค ควบคุมไว้ ทั้งยังคาสิโน สล็อต และก็เป็นที่ ยอมรับต่อนักเล่นการพนัน มากมายๆ ที่จะเข้ามาพนัน กับตัวพนันที่ร่วมสนุกสนานสำหรับเพื่อการเล่น

  • joker123 ที่พวกเราพรีเซ็นท์ เกมออนไลน์ได้เงินจริง ที่ตื่นเต้นเยอะแยะ กราฟฟิกงามไม่มีอันตราย ให้คุณเพลินและก็ศึกษาและทำการค้นพบระยะเวลาที่ความสนุกที่ pg และก็คุ้มค่ามาก

  • เว็บสล็อตออนไลน์ รองรับการเล่นทุกระบบ ไม่ว่าจะเป็น มือถือ หรือ คอมพิวเตอร์ pg slot ก็สามารถเล่นได้ พร้อมโปรโมชั่นมากมายที่รอคุณอยู่ เข้ามาเลยทำให้เว็บเรามีความรวดเร็วเป็นอย่างมาก