অমৃতের সন্ধানে- ৭

 

শিউলি চলে যেতেই প্রায় লাফ দিয়ে উঠে ওর গমন পথের দিকে তাকালো মানিক। ও চোখের আড়ালে যেতেই জিজ্ঞেস করলো – ও কে নানী।

-শিউলিকে তুই বুঝি চিনিসনে মানিক। তুইতো অনেককেই চিনিসনে ঠিক মত। তোর বড় নানার একটাইতো ছেলে আর ও হচ্ছে তোর সেই মামার ঐ একই মেয়ে। ডাক্তার, খুব ভালো মেয়েটা।

মানিক খুব আগ্রহ সহকারে শুনতে লাগলো নানীর কথা।

-তোর বড় নানা মারা যাওয়ার পর ওরা আর এদিকে খুব একটা আসে না, ঢাকার বাড়ীতেই থাকে। এখানকার ঘরদোর সব বন্দই থাকে। একটা লোক আছে সেই দেখাশোনা করে। কয়েকদিন হলো বাপ আর মেয়ে এসেছে। এখন নাকি ঢাকায় থাকার কোন উপায় নেই।

-ওর মা। আমি একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

রোকেয়া বেগম একটা নিঃশ্বাস টানলেন শব্দ করে।

-আর বলিসনে, বছর দুই হলো মারা গিয়েছে।

একটু থেমে আবার বললেন -কবর দেয়ার জন্য বাবা মেয়ে ঢাকা থেকে লাশ নিয়ে এলো। শিউলি ডুকরে ডুকরে সে কি কান্না, মায়ের কবর ছেড়ে ঢাকায় ফিরে যাবেই না। বেশ কিছুদিন ছিল এখানে। সারাক্ষন শুধু কাঁদতো। তারপর শান্তি করে কেঁদে কেঁদেই ওর মনটা শান্ত হলো। যে কয়দিন ছিল তোর মত করে সারাক্ষন ও আমার কাছেই থাকতো।

-তোকে নিয়ে অনেক কথা হতো ওর সাথে। ওকে বুঝ দেয়ার জন্যই তোর কথা বলতাম ওকে। তোর সন্মদ্ধে সব কিছু ও জানে। খুটিয়ে খুটিয়ে সব জিজ্ঞেস করতো।

-তোকে ও খুব ছোট বেলায় দেখেছে। ওর নাকি তোর সে চেহারাটা স্পষ্ট মনে আছে। ও বলতো তোর মা মরে গেলে তুই একটুও কান্নাকাটি করিসনি, শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়েছিলি। তার কারণ নাকি তুই বুঝতেই পারিসনি তুই কি জিনিস হারিয়েছিলি। কিন্তু ওর সমস্যা হচ্ছে ও বোঝে যে ও কি হারিয়েছে। ও বলতো তোর সব হারিয়েও কিছু না বুঝতে পারা মুখটা ওর নাকি পরিষ্কার মনে ছিল।

-শিউলির মামাতো ভাইও ওদের সাথে এখানে এসেছে। বেলাল নাম ওর, খুব ভালো ছেলে। লন্ডনে থাকে সবাই ওরা, সেও ডাক্তার। এসে আটকা পড়ে গেছে।

মানিকের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে রোকেয়া বেগম কথাগুলো বলছিলেন।

শিউলির প্রতি কিছুটা সহানুভূতি জন্মালো মানিকের।

-শিউলির সাথে বেলালের বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। বিয়েটা ঢাকাতেই হতো, কিন্তু যুদ্ধের কারণে এখন বোধহয় এখানেই হবে। তোর মামা মানে শিউলির বাবা সেদিন বলছিল বিয়েটা হয়ে গেলে তারপর যুদ্ধের পরিস্থিতি বুঝে বেলাল শিউলিকে সাথে করেই লন্ডনে চলে যাবে।

নানীর কথাগুলো মন্ত্রমুগ্ধের মত হয়ে শুনছিলো মানিক। শিউলিকে ওর বেশ ভালো লাগলো মনে মনে।

-স্বপ্নের মত শহর লন্ডন, শিউলি ডাক্তার, ওর স্বামীর সাথে সুখে থাকবে।

কথাটা ভেবে ছোট্ট একটা নিশ্বাস টেনে উঠে বসলো মানিক।

প্রায় মাস দেড়েক হয়ে গেল মানিক এসেছে এখানে। নানীর সঙ্গটা বাদে এখানকার বাকি জীবনটা মানিকের কাছে অনর্থক আর একঘেয়ে হয়ে উঠেছে ইতিমধ্যেই। দূরদূরান্ত থেকে আশ্রয় নেয়া মানুষগুলো সবাই শুয়ে বসে আর যুদ্ধের কথা আলোচনা সমালোচনা করা নিয়ে সময় কাটায়। সন্ধ্যার পর সবাই আবার কাচারিঘরে রেডিও ঘিরে বসে। এর মধ্যেই জীবন সীমাবদ্ধ এখানে।

মানিকও মাঝে মধ্যে যেয়ে বসে সেখানে। শোনে সবার কথা।

যুদ্ধের আর দেশের ব্যপারে আলাপ আলোচনায় বেলালই সব সময় অগ্রনী ভূমিকা পালন করে। আলোচনার ফাকে ফাকে তিনি ইউরোপ আমেরিকা সহ বড় বড় সব দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ইত্যাদি ব্যপারে ওর বিভিন্ন অভিজ্ঞতালদ্ধ উদাহরন দিয়ে সবাইকে অবাক করে তোলে।

অনেক মুরব্বীর প্রশ্নের জবাবে বেলাল যে ভাবে কঠিন কঠিন ইংরেজীর সাথে সাহেবী বাংলা মিশিয়ে তাদেরকে হতবুদ্ধি করতে চায় তাতে বোঝা যায় তার মূল উদ্দেশ্য প্রশ্নের জবাব দেয়া না বরং নিজের আধিপত্য বিস্তার করা। তিনি নিজে জ্ঞানী, আর সেটা প্রমান করার জন্য সবসময়ই তৎপর বেলাল।

বিষয়টা মানিকের একদম পছন্দ হয় না।

প্রতিদিনকার মত সেদিন সন্ধ্যায়ও বাড়ীর সামনে কাচারিঘরে বেশ লোকজনের সমাগম হয়েছে। এ বাড়ীর অনেকে ছাড়াও গ্রামের বিভিন্ন বয়সী লোকজনও আছে। মূখ্য আলোচনাকারী যথানিয়মে বেলাল।

পোশাক পরিচ্ছদ, আচার আচরন ও কথাবার্তায় বিশেষ যত্নবান বেলাল। শক্ত সামর্থ চেহারার প্রায় ত্রিশ বছরের একজন জ্ঞানী রূচিসন্মত মানুষ। পাচ ফুট দশ ইঞ্চির মত লম্বা, গায়ের রং ফর্সাই বলা যায় একটু ভারী দেহের অধিকারী। ওর চেহারা, লেখাপড়া, রূচি সব মিলে একজন আকর্ষনীয় মানুষ। সব মিলে শিউলির উপযুক্তই বটে।

আলাপরত বেলালর দিকে পলকহীন চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে কথাগুলো ভাবছিল মানিক।

পিছনের দিকে এক কোনায় একটা চেয়ারে মানিক বসা। সাধারণত সন্ধ্যার এ ধরনের আলোচনার সময় আসলে মানিক পিছন বা কোন কোণাতেই বসে। নীরবে শোনে সবার কথা। আর কথা শোনার চায়তে এখানে বসলে অন্য সব মানুষদের দেখা যায়।

স্বাধীন বাংলা বেতারের খবরটা শেষ হওয়া অব্দি সবাই থাকে এখানে। মানিকও মাঝে মধ্যে খবরটা শুনেই তারপর ভিতরে যায়।

শিউলিকে দেখা আর ওর সাথে বেলালের বিয়ের কথাটা জানার পর থেকে মানিক ওর কথা শোনার পরিবর্তে ওর চালচলন কর্থাবার্তা ইত্যাদি আরো মনোযোগের সাথে লক্ষ্য করে।

সেদিনও মানিক পলকহীন চোখে বেলালের দিকে তাকিয়ে। এরই এক ফাঁকে বেলালের অদূরে এক পাশে উপবিষ্ঠ শিউলির সাথে চোখাচোখি হলো মানিকের। অপ্রত্যশিত ঘটনা, একটু হতচকিত হয়ে গেল মানিক। মনে হলো শিউলি অনেকক্ষন ধরেই ওকে দেখছে।

লজ্জা পেয়ে চোখ ঘুরিয়ে নিল মানিক। নিজের কাছেই খারাপ লাগলো। ও ভাবে বোকার মত বেলালের দিকে তাকিয়ে থাকার কথা ভেবে। কি জানি কি ভাববে শিউলি।

ভারী অস্বস্তি লাগলো মানিকের।

পরোক্ষনেই অনেকটা নিজের অজান্তেই ওদিকে তাকাতেই ওদের চোখাচোখি হলো আবার।

শিউলি একটু মিষ্টি করে হাসলো।

মানিকের বুকের মধ্যে ধক ধক করতে লাগলো। ভাবলো ওর বোকার মত অমনিভাবে আবার তাকানো ঠিক হয়নি। অমনি ভাবে বোকার মত তাকিয়ে থাকাটা হাস্যকরতো বটেই।

আস্তে করে উঠে বেরিয়ে গেল মানিক।

সেদিন সকাল থেকেই বৃষ্টি শুরূ হয়েছে ফিস ফিস করে। মানিক নাস্তা করে নানীর পাশে বারান্দায় পাতা মাদুরের উপর বসেছে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে। একটু শীত পড়াতে ওরা পায়ের উপর একটা কাঁথা টেনে দিয়ে বসে কথা বলছে।

শিউলি আসলো। রোকেয়া বেগম বসতে বললেন। শিউলি রাঙাদাদীর অন্য পাশে হেলান দিয়ে বসলো।

মানিকের চুলগুলো সবসময়েই একটু অগোছালো। নানীর পাশে বসলে নানী সবসময়েই ওর এলোমেলো চুলগুলোর ভিতর আঙুল সঞ্চালন করে। আর মানিক ছোট্ট ছেলের মত আদরে চোখ বন্দ করে থাকে।

মানিককে ওভাবে আদর করতে দেখে খুব ভালো লাগলো শিউলির।

শিউলি এসে বসায় ভারী ভালো লাগলো মানিকেরও।

বেলাল এ ভাবে বসা বা এ ধরনের হালকা কথাবার্তা বলা ঠিক পছন্দ করে না। তাছাড়া ওর আলাপ আলোচনার বিষয়বস্তুগুলো বিশেষ বিজ্ঞজনদের মত। তায় মাঝে মাঝে শিউলি এভাবে আসলেও বেলালকে আসতে বলতে ঠিক আশ্বস্ত বোধ করেন না রোকেয়া বেগম।

-বেলাল কি করছে একা একা?

-নিশ্চয় বইটই পড়ছে বা রেডিওতে দেশ বিদেশের খবর শুনছে।

ওর কণ্ঠে যেন উষ্ণতার অভাব।

রোকেয়া বেগমও একটু অবাকই হলেন। মানিকের কাছেও জবাবটা ঠিক আন্তরিক মনে হলো না।

-বেলাল সাহেব দেশ বিদেশের অনেক খবর রাখেন। এখানে দৈনিক খবরের কাগজ না পাওয়াতে বোধহয় রেডিওই ওর একমাত্র নির্ভর।

মানিকের কথায় শিউলি মনে হলো বিরক্ত হলো।

-তা বোধহয় হবে। সংক্ষিপ্ত জবাব শিউলর।

সবাই কিছুক্ষন চুপচাপ। নীরবতা ভাঙলো শিউলি।

-মানিক তোমার এ্যজমার অবস্থা এখন কেমন?

-এখন মানিক ভালো আছে আগের তুলনায়।

রোকেয়া বেগম উত্তরটা দিলেন। তিনিই শিউলিকে বলেছিলেন ওর এ্যাজমার ব্যপারে।

-এ্যজমা থাকতেই ভালো ছিলো।

মানিকের কথায় শিউলি তাকালো ওর দিকে।

-শ্বাস কষ্টে হাসপাতালে ভর্তি হলে বাবা ছুটে আসতেন যেখানেই থাকুক না কেন। ভালো হয়ে না উঠা পর্যন্ত থাকতেন আমার সাথে।

রোকেয়া বেগম বৃষ্টির পড়ার ফোটা দেখার অছিলায় কিছু না শোনার চেষ্টা করছেন। শিউলি একটু অবাক হয়ে দেখলো ওদের দুজনকেই।

-আরে তখনতো আমি ছোট ছিলাম সে অনেক দিনের কথা। এখন আমি অনেক বড় না।

পরিস্থিতি হালকা করার জন্য মানিক বললো।

রোকেয়া বেগমের একই ভাবে তাকিয়ে রইলেন বৃষ্টির দিকে।

মানিকের বাবার অন্য সংসার, সেখানে মানিককে নিয়ে রাখার ব্যপারে ওর অসহায়ত্ব সব কিছুই জানেন রোকেয়া বেগম। মানিককে তিনি তার নিজের কাছেই রাখতেন। মানিকের বাবা শত চেষ্টা করেও ওকে নিতে পারতো না। কিন্তু ওর পড়াশোনা আর ওর ভবিষ্যৎ চিন্তায় ওকে দূরে যেতে দিয়েছেন রোকেয়া বেগম।

-যুদ্ধ বেধে ভালোই হয়েছে তোমার জন্য, কি বল মানিক?

সবকিছু একটু হালকা করার জন্য মৃদু হেসে শিউলি বললো।

রোকেয়া বেগমও হাসলেন একটু। বোঝা গেল শিউলির প্রশ্নের হ্যাঁ সূচক জবাব।

মানিকও মৃদু হাসলো।

-যুদ্ধ না বাধলে আপনার সাথেওতো এভাবে পরিচয় হতো না।

মানিকের মন্তব্যে সবাই হাসলো সশব্দে।

-তা ঠিকই বলেছে মানিক। হাসতে হাসতে বললেন রোকেয়া বেগম।

-আমার সাথে পরিচয় হওয়া কোন গুরূত্বপূর্ণ বিষয়ই না।

-অবশ্ব্যই গুরূত্বপূর্ণ বিষয়, অন্ততঃ আমার জন্যে।

মানিকের কথায় শিউলি এবং রোকেয়া বেগম দুজনই তাকালো ওর দিকে।

মৃদু হাসছে মানিক, মুখ টিপে টিপে। দুষ্টুমিতে ভরা ওর মুখটা।

মানিকের হাসিটা যেন একটু অন্য রকম। ও হাসলে ওর চোখ কান চুল ওর সারা অঙ্গই যেন হাসতে থাকে ওর সাথে।

ভারী ভালো লাগলো মানিককে শিউলির।

-তোমার মানিক ভারী দুষ্টু রাঙাদাদী।

এভাবে রোকেয়া বেগমের কাছে বসে অনেক গল্প হয় মাঝে মাঝে ওদের মধ্যে। কখনো দুষ্টুমি কখনো গম্ভীর।

Category: Bangla, Novel

Comment List

Your email address will not be published.

  • Can I simply just say what a relief to uncover somebody that really knows what they are discussing on the internet. You definitely realize how to bring a problem to light and make it important. A lot more people should check this out and understand this side of the story. I cant believe you arent more popular because you definitely have the gift.

  • כאן בפורטל הבית שלנו תקבלו את כל היחס המועדף, את השירות הטוב ביותר את
    האחריות כי התמונות בהן צפיתן אמיתיות ואותנטיות- אחת יותר מהשנייה.
    כשתבחרו בדירה דיסקרטית בבאר שבע , תקבלו חוויה
    מושלמת הכוללת פינוקים ובחורה שתעניק לכם הגשמת פנטזיות לפי טעמכם ולפי הצרכים שלכם.
    בדירה הדיסקרטית הממוזגת והנקייה,
    תמצאו מיטת שינה ועיסויים מושלמת ונוחה.
    הדירות מושקעות בקפידה כדי לא להחסיר ממך דבר וליצור לך חוויה מושלמת בפרטיות ודיסקרטיות מוחלטת.

    הדירות נבחרו בקפידה על מנת לתת מענה לכל דרישות הלקוחות
    באשר הם. ולכן אנחנו ריכזו עבורכם באתר שלנו ואפליקציה את מיטב הדירות הדיסקרטיות שנבחרו על ידינו בקפידה תוך הקפדה
    על איכות ושירות מעולים. הן מקרינות חום משחרר מתוך גופן אל
    תוך גוף הגבר וגורמות לו לגירוי וריגוש נהדר אשר ממלא את המצברים.
    באופן כללי, ישנן נשים שמרגישות בנוח
    יותר להיות ביסטואציה של עיסוי אל מול אישה ולא אל מול גבר.
    פשוט לחצו על עיסוי בשרון והזמינו מהמטפלים המופיעים באתר.
    נכנסים לפורטל הבית שלנו, שמים את היד על המודעה השווה ביותר והנה, זה עומד לקרות גם לכם.
    כן, זה אפשרי וזה אפילו הכרחי, זה
    יכול לשנות לכם את החיים מהקצה אל הקצה ולכן אנו בפורטל הבית
    מזמינים אתכם להצטרף ללא חשש לשירות שיעשה סדר לא רק בחיי
    המין שלכם אלא הרבה מעבר לכך.