অমৃতের সন্ধানে- ৬ 

 

মানিকের লেখাপড়া শুরূটা গ্রামের স্কুলে ওর নানী রোকেয়া বেগমের কাছে থেকেই। ক্লাস সিক্স পর্যন্ত ওখানেই ছিল। ক্লাস সেভেন থেকে ওর বাবা ওকে একটা রেসিডেনসিয়াল স্কুলে ভর্তি করে দিলেন।
অনেক কান্নাকাটি করলেন রোকেয়া বেগম কিন্তু মানিকের ভবিষ্যৎ জীবনের কথা চিন্তা করে এ ব্যবস্থাই মত দিলেন তিনি।
ক্লাসে প্রথম হওয়া, ফুটবল টুরনামেণ্টে গোলটা করা। দৌড়ে সবাইকে পিছনে ফেলে যাওয়া যেন মানিকের একচ্ছত্র অধিকার হয়ে উঠলো। নিজের অর্জিত প্রাপ্তিতে সকলের বাহবা ওর বঞ্চিত মনের অবলা বেদনার বরফ গলাতে সহায়ক হলো। অর্জনের ক্ষেত্রে জীবন ওকে উজাড় করে দান করলো।
পাওয়ার আনন্দ আর নেতৃতের তৃপ্তি ওকে নেশগ্রস্থ করে ফেললো। পাওয়া যেন ওর কাছে শেষ হওয়ার কোন বিষয় নয়। নিজের সব রেকর্ড প্রতিনিয়ত নিজে ভাঙতে ভাঙতে সব সময় নতুন নিজেকে আবিষ্কার করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠলো মানিক।
পুরানো কোন কিছুই ওকে আকর্ষন করে না। পুরানো সব কিছুতেই কেমন যেন অনীহা ওর। কারো সাথেই ওর বন্ধুত্ব দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কারণ নতুনত্ব ফুরিয়ে গেলেই সব কিছুতেই ওর আকর্ষন শেষ হয়ে যায়।
তবে ভালবাসার কাঙাল ও। ওর মতে প্রকৃত ভালবাসা কখনো পুরোনো হয় না আর একঘেয়েও লাগে না। একটা মানুষকেই ও পেয়েছে ওর জীবনে যাকে ওর কখনো একঘেয়ে লাগেনি, সে ওর নানী।
অজানা গন্তব্যে যাত্রার প্রতি আসক্তিটা মানিকের চিরকালের। ওটাও বোধকরি ঐ নতুনের সন্ধান। অজানা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে একটা আকর্ষন আছে। এটা এমনি একটা আকর্ষন যা মানুষকে আশার সপ্ন দেখায় বর্তমানকে ভূলতে সহায়ক হয়।
একটা ঝাপটা বাতাস বয়ে গেল। আমের মুকুলের এক মাদকীয় গন্ধ ভেসে আসলো। বাংলার এই এক বিশেষত্ব, সব ঋতুরই একটা আলাদা স্বাদ আর গন্ধ আছে।
গাড়ীতে আসা ওর সাথে যারা কয়েকজন ছিল ওরা হয়তো আশে পাশে গিয়েছে কোথাও। কখন ফিরবে কে জানে।
স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছে তা প্রায় ত্রিশ বছরের ও বেশী হলো। যুদ্ধের সময় মানিক স্কুলের ছাত্র। ক্লাস বন্দ হয়ে গেল। শুরূ হলো মুক্তি যুদ্ধ। শহর আর রাস্তা ঘাটের পাশের মানুষ গুলো হায়নারুপি সেনাদের হাত থেকে বাচতে গভীর গ্রামে যেয়ে আশ্রয় নিল।
ও ফিরে গেল ওর নানীর কাছে। গ্রামটা শহর বা পাকা রাস্তা থেকে বেশ গভীরে।
দূরে থাকা মানিককে পেয়ে নানী যেন নিজের প্রাণপাখীকে খুজে পেলেন কত যুগ পর। আর মানিক পেল নিরবিচ্ছন্ন উষ্ণ ভালবাসার আশ্রয়। যুদ্ধ যেন দুটি তৃষ্ণার্ত আত্মার মিলন ঘটিয়ে দিল।
গ্রামটা অনেক ভিতরে হওয়াই মোটামুটি নিরাপদ তায় বিভিন্ন শহর বন্দর থেকে অনেক মানুষই আত্মীয়তার বন্ধন সুত্রে এখানে আশ্রয় নিয়েছে। এত দিন ভূলে থাকা অবহেলিত গ্রামগুলোতে আজ অনন্যপায় হয়ে শহর ছেড়ে আসা মানুষগুলো আশ্রয় নিয়েছে। ওরা ভূলে যাওয়া মূল বন্ধনের সূত্রকে বিভিন্ন কথার ফুলঝুরিতে গ্রামের সহজ সরল মানুষদের উজ্জীবিত করে তাদের আশ্রয় নেয়াটাকে যুক্তিসংগত করতে ব্যস্ত।
কিন্তু প্রকৃতই মাতৃরূপী গ্রাম কথার ফুলঝুরি বা অর্জনে বিশ্বাসী নয়। দেয়াতেই শুধু তাদের আনন্দ।
উচু উচু বৃক্ষের ডালপালাগুলো আকাশের অসীমতায় বিমুগ্ধ হয়ে মাটিতে মিশে থাকা শেকড়কে তুচ্ছ ভেবে যদি ভূলে যায়, তাতে শেকড়ের কিছু আসে যায় না। শেকড় নীরবে কর্তব্য করে সব সময়, দেয়াতেই যত আনন্দ। আজ যখন জীবনের তাগিদে ব্যস্ত থাকা শহরের মানুষগুলো যারা গ্রামকে তুচ্ছ ভেবে দুরে ছিল তারা হিংস্র হায়নাদের হাত থেকে জীবন বাচাতে আশ্রয়ের খোজে গভীর গ্রামে এসেছে, তখন মাতৃসম গ্রাম কি মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারে! চির অবহেলিত গ্রামগুলো সব অভিমান ভূলে তার যা আছে তার সব কিছু অগন্তক অতিথিদেরকে বিলিয়ে দিয়ে যেন কৃতার্থ হচ্ছে। মহানুভবতার এ এক অনুকরণীয় উদাহরণ।
মানিকের নানারা ছিলেন এ অঞ্চলের জমিদার। সে আমলের বিরাট জমিদারী বাড়ীটা এখনো ঐ অবস্থাতেই দাড়িয়ে আছে। সে অর্থে জমিদারী না থাকলেও এখনো অনেক জমির মালিক ওরা। তাছাড়া ওদের বংশ মর্যাদার খাতিরে এ অঞ্চলের সবাই এখনো ওদের মান্য গন্য করে।
রোকেয়া বেগমের বাবার বাড়ী পাশের গ্রামে। বংশ মর্যাদা বা ঐশ্বর্য কোন দিক দিয়ে ওরা কোন ভাবেই এই জমিদার পরিবারের সমকক্ষ নয়। বংশ মর্যাদার মাপকাঠিতে এই বংশে বিয়ে হয়ে আসতে পারাটা রোকেয়া বেগমের সৌভাগ্য বটে।
একহারা চেহারা, সরু লম্বা গ্রীবা, সুচালো নাক আর টকটকে ফর্সা গায়ের রং রোকেয়া বেগমের। এক কথায় বলা যায় রোকেয়া বেগম অনিন্দ সুন্দরী। মানিকের নানা রোকেয়া বেগমের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে রোকেয়া বেগমের আর নিজের এবং শশুরের পরিবারের সবার অমতেই অনেকটা জোর করে সুন্দরী রোকেয়াকে বিয়ে করেছিলেন।
বিয়ের প্রথম থেকেই এ পরিবারের অধিকাংশই তাকে মন থেকে গ্রহন করেনি। অনেক ধরনের মন্তব্যের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। সংসারে অনেকটা একঘরো হয়ে বাস করতেন রোকেয়া বেগম। অনেকে ওর স্বামীকে উপযুক্ত বংশে দ্বিতীয় বিয়ে করানোর চেষ্টাও করেছিল।
দিন গুলো ছিল অবর্ণনীয় শ্বাসরূদ্ধকর। শুধু মাত্র স্বামীর অকৃত্তিম ভালবাসা ওকে সব কিছু ভূলে সামনে তাকানোর প্রেরণা যুগিয়েছিল।
কি অসহনীয় ছিল দিনগুলি।
বিয়ের দুবছরের মাথায় তিনি সন্তান সম্ভাবনা হয়েও প্রায় পাচ মাসের মাথায় সন্তানটি গর্ভপাতে নষ্ট হয়ে যায়। ঘটনাটি ওর নিজের জন্য বেদনাদায়ক হলেও সুযোগ বুঝে অন্যান্য সকলে তাকে অপয়া দুর্ভাগা ইত্যাদি বলে তার জীবনটাকে আরো দুর্বিষহ করে তুলেছিল।
একাকী নিরবে নিভৃতে কত চোখের জল ফেলেছেন তিনি।
তারপর তার কোল জুড়ে আসলো আমিনা। রোকেয়া বেগমের প্রথম সন্তান, মানিকের মা আমিনা। অতি আদরের সন্তান রোকেয়া বেগমের। ও যেন এক স্বর্গীয় স্বাদ নিয়ে এল। রোকেয়া বেগমকেই শুধু নয় ও যেন সবাইকেই যাদু করলো।
একান্নবর্তী সংসারে চার ভায়ের প্রথম কন্যা সন্তান আমিনা, তার যাদুতে রাতারাতি রোকেয়া বেগমের প্রতি ঐ পরিবারের তিক্ত ব্যবহারের অবসান হলো। রোকেয়া বেগমের নিজের আর ঐ পরিবারের জন্য আমিনা যেন আর্শিবাদ হয়ে আসলো।
কিন্তু কি হলো! সৃষ্টিকর্তার কি লীলা! আমিনা যেন পৃথিবীতে আসলো শুধু জ্বলতে। নীরবে জ্বলে জ্বলে নিঃশ্বেষ হয়ে সব কিছু রেখে আবার সব ভব লীলা সাঙ্গ করে অসময়ে চলেও গেল।
সবাইকে যাদুতে মোহিত করে ওর যাদুর চাক্ষুষ পরশ, মানিককে রেখে গেল টুপ করে বিদায় নিল। তার রেখে যাওয়া সে যাদুর পরশ রোকেয়া বেগমকে মেহনীয় করে রাখলো। মাতৃহারা শিশু মানিককে তিনি বুকে তুলে নিয়ে তার মাতৃত্বের সবটুকু নির্যাস ঢেলে দিলেন।
কিন্তু কর্তবের টানে বাস্তবতার কাছে নতি স্বীকার করে পড়াশোনার জন্য সেদিন মানিককে ছাড়তে হয়েছিল। রোকেয়া বেগম কখনো ভাবতে পারিনি যে মানিককে আবার কোনদিন এভাবে ফিরে পাবে। যদিও মানিক দূরে থাকলেও রোকেয়া বেগমের প্রতি মুহুর্তের চিন্তা চেতনা ঐ মাতৃহারা মানিককে ঘিরেই আবর্তিত হত।
যুদ্ধ সেই মানিককেই কাছে এনে দিয়েছে।
মানিকও হারানো উষ্ণতা ফিরে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা।
ঐ সময়টাতে বাংলার ঋতুর রাজরূপ নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে দেখার সুযোগ পেয়েছিল মানিক। অপরুপ প্রকৃতির পাশাপাশি দেখেছিল কত মানুষকে। পেয়েছিল জীবনের নতুন অভূতপূর্ব আস্বাদন।
ওর নানারা চার ভাই। সকলের ছেলে মেয়ে মিলে অনেক বড় পরিবার। গ্রামের এক পাশে অনেক বড় জায়গা জুড়ে উঁচু পাচিল ঘেরা বাড়ীটা। সামনে বিরাট কাচারিঘর।
চার ভায়ের ছোট ভাই ওর নানা। বড় ভাই বাদে অন্যান্য সবাই বেচে আছেন। বৃদ্ধ বয়সে ভায়েরা সবাই বাড়ীতে থাকলেও ছেলে মেয়েরা নিজ নিজ কাজ পড়াশোনা ইত্যাদি নিয়ে বাইরেই থাকে। এ পরিবারের সবার সাথে মানিকের পরিচয় নেই।
স্বাধীনতা যুব্ধ মোটামুটি সবাইকে প্রাণভয়ে বাড়ীতে নিয়ে এসেছে। সবাই সবার সাথে নতুনভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ লাভ করেছে।
কাজে ব্যস্ত মানুষগুলো এখানে এসে জলের মাছ ডাঙায় ওঠার মত অবস্থা। কারো কিছু করার নেই, সবার মুখেই যুদ্ধের আলোচনা। কত ধরনের যল্পনা কল্পনা। সন্ধ্যার পর পরই রেডিও নিয়ে বসা। নানা রকম মন্তব্য; যুদ্ধ কতদিন চলবে, যুদ্ধের মোড় কখন কোন দিকে ঘুরবে, হানানাদার বাহিনী আসলে কি হবে ইত্যাদি।
বাড়ীর সামনে পুরনো আমলের উচু বারান্দা ঘেরা বিরাট কাচারিঘর। সন্ধ্যার পর পরই গ্রামের বড় ছোট সব বয়সের মানুষ সেখানে ভীড় জমায়। রেডিও শোনা আর শহর থেকে আসা শিক্ষিত মানুষদের মুখ থেকে নানা উপদেশ শোনার জন্য।
বেশ কিছুদিন চললো এভাবে। কিন্তু এখানকার জীবনটা দিনে দিনে মানিকের কাছে একঘেয়ে হয়ে উঠলো। এরকম শুয়ে বসে আর বই পড়ে কতোক্ষন পারা যায়। হাফিয়ে উঠলো ও মাসখানেকের মধ্যেই।
শুধু মাত্র নানীর উষ্ণতা আর অনাবিল ভালোবাসা বাদে বাকি সবই ওর কাছে অসহনীয় হয়ে উঠতে লাগলো দিনে দিনে।
সারা দিনভর বাড়ীর সব মানুষ যখন দেশের কথা আর যুদ্ধের বিভিন্ন ব্যপার আলোচনা বা সমালোচনা করতে ব্যস্ত মানিক তখন নাীনর পাশে বসে বা কোলে শুয়ে বই পড়ে, কথা বলে সময় কাটায়। মাঝে মাঝে মানিকও কাচারিঘরে আলোচনা শুনতে যায় তবে সবকিছু ওর কাছে কেউ স্বাধীনতার জন্য কোন কাজ না করে কেবলই কথাবার্তা বলা নিচক অন্তঃসারশূন্য বাকবাড়ম্বতা মনে হয়।
একটু হাটা চলা করার ইচ্ছা হলে মানিক বাড়ীর সামনের বড় দিঘিটা বা একটু দূরে গাঙের পাড়টাতে যায় মাঝে মধ্যে।
সকালে নাস্তার পর কোথাও যেতে ইচ্ছা করছিল না মানিকের। নানী অবধারিত ভাবে ওর কামরার সামনে উঁচু বারান্দায় মাদুরের পরে পা ছড়িয়ে বসে পান বেটে চিবুচ্ছে। মাদুরের উপর সাজানো ওর অতি যত্নের বিভিন্ন সুগন্ধিযুক্ত জর্দার সম্ভার। অনেকেই আসছে ওর হাতের পান খাওয়ার জন্য। খেতে খেতে নানা রকম কথা বার্তাও হচ্ছে।
নানীর কোলের উপর মাথা রেখে মাদুরের উপর শুয়ে একটা বই পড়ছিলো মানিক। এটা ওর প্রতি দিনকার রূটিন।
রোকেয়া বেগমের পান খাওয়ার সরঞ্জাম বা বিভিন্ন রকমের জর্দার একটা একটা বিশেষত্ত আছে। পান খাওয়ার অভ্যাস তার প্রথম থেকেই তায় তার স্বামী ওগুলো বিভিন্ন জায়গা থেকে বেছে বেছে তাকে এনে দিয়েছে। সব গুলো পাত্র আর জর্দ্দার পিছনে এক একটা কাহিনী আছে। সে গুলোর বর্ণনা দিতে দিতে তিনি নানা কথা বলেন, যেমন -এটা তোর নানা অমুক জায়গায় বেড়াতে যেয়ে আমার কথা মনে পড়াতে কিনেছিলো বা এই জর্দাটা ওকে দেয়ার সময় নানা মুচকি হেসে কি মন্তব্য করেছিল ইত্যাদি।
প্রতিটা সামগ্রী কেনা আর তা তাকে উপহার দেয়ার পিছনের ছোট ছোট ঘটনাগুলো রোকেয়া বেগমের কাছে তাঁর স্বামীর অকৃতিম ভালবাসার এক একটা যেন অকাট্য দলিল যা অতি আদরের সাথে বৃদ্ধা ওর মনের গভীরে তার সবটুকু লালন করে। ছোট ছোট বর্ণনা গুলো দেয়ার সময় ওর চোখে মুখে এক স্বর্গীয় দ্যুতি বয়ে যায়। মানিক আদরের অতিসয্যে নানীকে জড়িয়ে ধরে ওর মুখের সাথে মুখ লাগিয়ে তা উপলব্ধি করার চেষ্টা করে।
তার পান খাওয়া মুখের গন্ধ সব সময় মানিককে মোহিত করে।
সকাল থেকে অনেকেই নানীর হাতের পান খেয়ে গেল।
-রাঙাদাদি দেখি তোমার পানে কি যাদু আছে। অপরিচিত সুরেলা কণ্ঠ। মাথাটা আলতো ভাবে ঘুরিয়ে তাকালো মানিক।
রোকেয়া বেগমের গায়ের রংটা টকটকে ফর্সা। তায় তাকে যেকেউ কোন সম্পর্ক ধরে ডাকলে সম্বোধনের আগে রাঙা কথাটা জুড়ে দেয়। এটা মুলতঃ রোকেয়া বেগমের মৃত শাশুড়ী তার গায়ের টকটকে ফর্সা রঙে মুগ্ধ হয়ে আদর করে রাঙা বৌ সম্বোধন করা থেকেই উৎপত্তি। এখন সকলে তাকে কেউ রাঙামা, রাঙাদাদি, রাঙাবউ, রাঙাচাচি ইত্যাদি বলে সম্বোধন করে।
গায়ের রংটা চাপা ফরসা, একহারা গড়নের এক সুন্দরী তরূনী। ফেড জিনসের প্যণ্টের উপর হালকা গোলাপি রংএর কামিজ, ওড়নাটা গলায় একটা প্যাচ দিয়ে লম্বা করে নামিয়ে দেয়া, শ্যাম্পু করা ঝরঝরে ছেড়ে দেয়া চুলগুলো কোমরের ঠিক উপরটা ছুঁই ছুঁই করছে, পায়ে কামিজের রংগের সাথে মিলিয়ে দুই ফিতার স্যান্ডেল।
কথাগুলো বলতে বলতে মেয়েটি নানীর পাশে এসে বসলো। পারফিউমের মিষ্টি গন্ধে বাতাস ভরে গেল।
-একে তো দেখিনি, ও কে রাঙাদাদি। সুপারির একটা টুকরা মুখে নিয়ে তা দাতে কাটতে কাটতে ও জিজ্ঞেস করলো।
আগন্তক মেয়েটিকে দেখার ইচ্ছেটা সংবরন করার জন্য মানিক অনেকটা জোর করেই বইয়ের পাতায় চোখ আটকে রাখল।
-কেন আমার আমিনার ছেলে।
– আমিনা খালার ছেলে! একটু অবিশ্বাসের সুর।
– হ্যাঁরে, আমিনা মারা যাওয়ার সময় বোধহয় তুই ওকে দেখেছিলি। তখনতো ও কোলে দুধের বাচ্চা, তারপরতো আর বোধহয় দেখিসনি। আর দেখবিই বা কি করে তোর ডাত্তারী পড়ার যে চাপ তাতে করে আর তোরতো এদিকে খুব একটা আসা হয় না।
পানে জর্দা মিশাতে মিশাতে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন রোকেয়া বেগম- দেখা সাক্ষাৎ না থাকলে দেখ আপনও কি করে পর হয়ে যায়। আর তোরও তো মনে থাকার কথা না শিউলি, কারণ আমিনা মারা যাওয়ার সময় তোর বয়সই বা কত, চার পাচ হবে বেশী হলে।
-তুই কি পানের পাতা চিবিয়ে দেখবি কেমন লাগে?
কথাটা বলে রোকেয়া বেগম ওর হাতে একটা ছোট পানের টুকরো উঠিয়ে দিয়ে আবার নিজের মনে সুপারি টুকরো করতে মনোনিবেশ করলেন।
-রাঙাদাদি তাহলে এই তোমার মানিক!
কথাটা বলে শিউলি মানিকের দিকে গভীর ভাবে তাকালো। ওর চোখে মুখে একটা অনুসন্ধিৎসু ভাব প্রতিভাত। তাতে কিছুটা সহানুভূতির ভাবও পরিষ্কার ভাবে জড়ানো ছিল।
মানিকের বিরক্তি আর আপত্তির কারণটা ওইখানে। ওর মায়ের অকাল মৃত্যুর ব্যপারটা সবাই কেন জানি আফসোচ করা আর দরদ দেখানোর উপলক্ষ হিসাবে ব্যবহার করে। তায় ব্যপারটা নানী ছাড়া অন্য কেউ আলোচনা করলে মনে হয় দয়া দেখানোর অযাচিত প্রয়াস।
দরদ দেখানোর এহেন প্রচেষ্টাকে অগ্রাহ্য করার জন্য বইয়ের মধ্যে ডুবে যাওয়ার চেষ্টা করতে লাগলো মানিক।
শিউলি কতক্ষন ওর দিকে ওভাবে তাকিয়ে ছিল মানিক তা জানে না। তবে অমন অপরিচিতা সুন্দরী মেয়ের গিলে খাওয়া দৃষ্টির সামনে প্রতিটা ক্ষন অনেক লম্বা মনে হতে লাগলো মানিকের।
কিছুই বললো না শিউলি। শুধু মানিকের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কি যেন গভীর ভাবে দেখলো বেশ কিছুক্ষন ধরে। তারপর আর কোন কথা না বলে সন্তর্পনে চলে গেল।

Category: Bangla, Novel

Comment List

Your email address will not be published.

  • of course like your website however you have to check the spelling on quite a few of your posts. A number of them are rife with spelling issues and I find it very bothersome to inform the truth then again I will definitely come back again.

  • I’ve learn several good stuff here. Certainly price bookmarking for revisiting. I wonder how much attempt you place to create this kind of magnificent informative site.

  • I know this if off topic but I’m looking into starting my own blog and was wondering what all is required to get set up? I’m assuming having a blog like yours would cost a pretty penny? I’m not very internet smart so I’m not 100 sure. Any recommendations or advice would be greatly appreciated. Cheers