অসহায় মানুষ -২১

 

ডাক্তার এল। ইংজেকশান দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখলো প্রদিপকে।
জ্ঞান ফিরলেই পাশে বসা বাবা মাকে দেখলে আবার ব্যথায় কাতর হয়ে জ্ঞান হারাতে লাগলো। তিন দিন কাটলো এভাবে।
ছেলের এ অবস্থায় রেবেকা বেগমের চোখ দিয়ে অশ্রুর বন্যা কিছুতেই থামলো না। তিন দিন প্রদিপের পাশে কাটিয়ে না ঘুমিয়ে তার শরীরও খুব খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু ছেলের কাছ থেকে একটু সময়ের জন্যও নড়লেন না তিনি।
নিজের কোন অতি প্রিয় জিনিস হারিয়ে গেলে ব্যথায় হৃদয় ফুটো হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। কিন্তু ওটা বিধাতার দান মনে করে যার দান সেই ফিরিয়ে নিয়েছে বলে কাছের মানুষ গুলোর শান্তনাতে মনটা ধীরে ধীরে হলেও শান্ত হয়। কিন্তু যে ধন বিধাতা সরাসরি দান করেনি, যা কুড়িয়ে পেয়ে ধীরে ধীরে বুঝে সুযে মানুষ নিজের করে নেয়, সেটা হারানোর ব্যথা বোধহয় খুব ভোঁতা হয়।

রাত প্রায় ভোর হয়ে এলো। প্রদিপ ঘুমিয়ে। পাশে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন রেবেকা বেগম।
নাসিম নেওয়াজ ঢুকলেন। ছেলের এ অবস্থায় তার চাল চলনে খুব একটা কিছু প্রকাশ না পেলেও তা তার চেহারার উপর অনিদ্রা আর দুশ্চিন্তার ছাপে পরিষ্কার ভাবে প্রতিভাত।
স্ত্রীর পাশে এসে দাড়ালেন তিনি।
-রেবেকা তোমার নিজের দিকে একটু খেয়াল করা দরকার নাহলে একটা অঘটন যে ঘটে যাবে।
-আমার আর কি অঘটন ঘটবে বল। বস একটু এখানে।
শান্ত সৌম্য কণ্ঠস্বর রেবেকা বেগমের।
নসিম নেওয়াজ বসলেন স্ত্রীর পাশে।
-মহা এক অঘটনের হাত থেকে যে ছেলে আমাকে একদিন ফিরিয়ে এনেছিল সেই যে নিজেই আজ মহাসংকটের দারপ্রান্তে। আর তুমি বলছো আমার নিজের দিকে খেয়াল করতে।
স্ত্রীর একটা হাত নিজের হাতের ভিতর নিলেন নাসিম নেওয়াজ।
-আমার আরো দুটো সন্তান আছে, ওদের সাথে প্রকৃতই আমার রক্তের সম্পর্ক। কিন্তু প্রদিপ আমার রক্ত না হয়েও ওই যে আমার সব। তুমিতো জানই ওকে আমি চোখের আড়াল করতে পারিনে এক মুহুর্তেও জন্যও।
-আমি সব বুঝি রেবেকা। আমাদের পরের ছেলে মেয়ে দুটোর জন্ম তোমার অমতে সেকথা আমার জানা আছে।
– প্রদিপকে আমি একটুও ঠকাতে চায়নি তায়তো ওর জীবনের চরম সত্য কথাটা ওকে বলতে আমিই মত দিয়েছিলাম। কিন্তু ও যে এভাবে ভেঙ্গে পড়বে কল্পনা করিনি।
কাদতে লাগলো রেবেকা বেগম।
– প্রদিপের জন্মদাতা মাকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। সে সাত রাজার ধন আমাকে নিঃস্বার্থ ভাবে দান করে একটুও অপেক্ষা করলো না। হতভাগী নিজের জীবন দিয়ে সন্তানকে বাচিয়েছিল।
রেবেকা বেগম তার একটা হাত দিয়ে প্রদিপের একটা হাত ধরে ছিলেন। হটাৎ করেই তার হাতে একটা চাপ অনুভব করলেন তিনি।
প্রদিপ মায়ের হাতটা চেপে ধরে ওর বুকের মধ্যে টেনে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদতে লাগলো।
কখন ওর ঘুম ভেঙেছে তা খেয়াল করেনি রেবেকা বেগম।
প্রদিপ বোধহয় ঘুম ভেঙে শুনছিল ওদের কথা।
-মা, মাগো আমি তোমারই ছেলে মা। আমি তোমার ছেলে হয়েই থাকতে চায়।
-পাগল ছেলে কোথাকার একি কোন বলার কথা হলো।
মায়ের হাতটা বুকে চেপে নীরবে অশ্রু সংবরন করতে লাগলো প্রদিপ।
-আচ্ছা মা বলনা আমার জন্মদাতা মায়ের কি হয়েছিল কি ভাবে মারা গেলেন তিনি।
নাসিম জোরদার উঠে খাটের এক কোন বসে প্রদিপের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ওর মাকে রাজধানি বস্তি থেকে নিয়ে আসা, রেবেকার মৃত্যুসজ্জা এবং ওই অবস্থায় ওর জন্মদাতা মায়ের মৃত্যুর ঘটনা বর্ণনা করলেন।
নিশ্চুপ হয়ে শুনছিলো প্রদিপ। রাজধানি বস্তির প্রতিটি মানুষ ঘরবাড়ী ওর চোখের সামনে ভেসে উঠলো। সে সব মুখের সাথে ওর মায়ের মুখটা মিলাতে চেষ্টা করলো।
রাজধানি বস্তি উচ্ছেদের কথা বস্তি সরদারের কাছ থেকে শুনেছিল প্রদিপ। তখন অনেক মানুষ নিখোজ হয়েছিল তাও শুনেছে ও। সে কথা শুনে তখন ওর দুচোখ বয়ে জল গড়িয়ে পড়েছিল।
সরদারের অসুস্থ স্ত্রী চাল চাপা পড়ে মরেছিল। কথগুলো বলতে বলতে সরদার হাউ মাউ করে কেদেছিল।
প্রদিপ সরদারকে শান্তনা দিয়ে বলেছিল -যা হবার তাতো হয়েছে এখন কেদে আর লাভ কি, ছেলে মেয়ে যারা আছে তাদের নিয়ে বাচতে হবে।
সরদারের কান্না কিছুতেই থামছিলো না। ও বিলাপের সুরে বুক চাপড়ে বলছিল – খোকাবাবু যার যায় সেই কেবল বোঝে সে ব্যথা। অন্যের পক্ষে সে ব্যথা বোঝা সম্ভব নয়।
এতদিন পর সেই ঘটনা মনে পড়াতে প্রদিপের বুক ফেটে যাওয়ার উপক্রম হতে লাগলো। প্রদিপ মায়ের কোলে মুখ লুকিয়ে কাদতে লাগলো।
-বাবা, তুমি কি জান আমার মায়ের অমন অবস্থা কেন হয়েছিল আর কে আমার জন্মদাতা বাবা?
-তোর মায়ের যে অমন অবস্থা কেন হয়েছিল তা আমরা কেউ জানিনে বাবা। তোর মা মারা যাওয়ার পর কাজলকে নিয়ে আমি গিয়েছিলাম বস্তিতে। তখন পুরোনো বস্তির কোন চিহ্নই ছিল না। আর বস্তিবাসীরা যে যার মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিল। যা দুএকজনের সাথে দেখা তারাও বলতে পারিনি কিছু।
-মা মৃত্যুর আগে বাবা সম্পর্কে বলে যায়নি কিছু?
-না বাবা সে সময় তার হাতে ছিল না।
চুপ করে রইলো প্রদিপ।
নাসিম নেওয়াজ তাকালেন স্ত্রীর মুখের দিকে।
একটা দীঘঃশ্বাস টানলো রেবেকা বেগম।
-তবে আজই খোজ পেয়েছি তোর জন্মদাতা বাবার।
অবাক হয়ে তাকালো প্রদিপ মায়ের মুখের দিকে।
-হে সোনা, আল্লারাখাই তোর জন্মদাতা বাবা।
নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলো প্রদিপ।
– আল্লারাখাকে প্রথম থেকেই সে চোখে দেখিস তুই। সে ভাবেই তাকে সম্মানও করিস। তুইতো কতবার বলেচিস যে আল্লারাখা আদর্শ এক বাবা। আর তোর গবেষণায় সেত একজন রোল মডেল।
কোন কথা বললো না প্রদিপ।
এ সব কি শুনছে ও। এত সব কি গল্প না সত্যি। ওকি সত্যিই এ পৃথিবীর কেউ না কেবল গল্পের কোন চরিত্র!
-আচ্ছা বাবা তিনি তাহলে অন্তরাকে মেয়ের মত লালন পালন কেন করছে। আর আমার জন্মদাতা মা রাজধানী বস্তিতে কি ভাবে গেল?
সৌম্য শান্ত কণ্ঠোস্বর প্রদিপের।
-সে সবের কিছুই আমরা জানিনে বাবা। একটু সুস্থ হলে তুই যা দেখা কর তার সাথে। আর তাকেই জিজ্ঞেস কর সবকিছু।
কোন জবাব দিল না প্রদিপ। কেবল নিজের মাথার চুলের মধ্যে আঙুল সঞ্চালন করতে লাগলো।
-মা, আমার এমন হচ্ছে কেন মা। কেবল সা সা শব্দে আমার কান বন্দ হয়ে যাচ্ছে কেন? এগুলো কিসের শব্দ মা। মনে হচ্ছে কোন বাধ ভাঙা জলপ্রপাতের শব্দ। শত শহস্র বছর ধরে জমে থাকা জল সব বাধন ভেঙে এক সাথে বের হতে চাচ্ছে। একি যন্ত্রনা মাগো আমি যে সহ্য করতে পারছি না।
জ্ঞান হারালো প্রদিপ।
-ওগো কি হচ্ছে এসব!
কান্নায় ভেঙে পড়লেন রেবেকা বেগম। নির্বাক ভাবে দাড়িয়ে নাসিম নেওয়াজ।

প্রায় ভোরের দিকে জ্ঞান ফিরলো প্রদিপের।
-ভোর হয়ে এলো তোমরা বিশ্রাম নাও। আমি একটু ঘুমোবো এখন। ঘুমাতে পারলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
প্রদিপের মাথায় হাত বুলিয়ে ওকে আদর করে বেরিয়ে গেল নাসিম নেওয়াজ আর রেবেকা বেগম।

প্রথম যেদিন নেওয়াজ বাড়ীতে যায় সেদিনই প্রদিপকে চিনেছিলো আল্লারাখা। স্ত্রী দোলনের কবরেও গিয়েছিল ও। নীরবে নিভৃতে কেবল চোখের জলে বুক ভাসিয়েছিল। মনে মনে দোলনের কাছে হাজার কোটি বার ক্ষমা চায়লো। কি অসম্ভব যন্ত্রনা বুকের ভিতর। যন্ত্রনায় বুকটা ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো কিন্তু টু শব্দটি করতে পারলো না।
গভীর ভাবে দেখেছিল প্রদিপকে। ওর এমন ভাগ্যের জন্য মনে মনে সর্বশক্তিমান আল্লার কাছে মাথা নত করেছিল আল্লারাখা।
ফিরে এসে একাকী ঘরের ভিতর দরজা বন্দ করে প্রাণ ভরে কেদেছিল সেদিন। নিজেকে শাস্তি দেয়ার জন্য মনকে শক্ত করলো আল্লারাখা। এমনিতেই অনেক ক্ষতি করেছে ওদের। নিষ্পাপ দোলনকে প্রাণ দিতে হয়েছে ওভাবে। মায়ের আর্শিবাদে পাওয়া প্রদিপের ভাগ্যকে একটুও প্রভাবিত করে এমন কোন কাজ করবে না মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলো আল্লারাখা।

-প্রদিপ ওর নিজের ছেলে তা জানা সত্বেও কাউকে প্রকাশ করবে না সে কথা। এত বছর ধরে খুজে বেড়ানো স্ত্রী সন্তানের খোজ পেয়েও কাউকে প্রকাশ করবে না ঘুর্ণাক্ষরেও।
প্রদিপ ওর রক্ত তবুও ওর উপর কোন অধিকারের দাবী নিয়ে দাড়াবে না কখনও। নিজের সন্তান! নিজের অস্তিত্বকে জড়িয়ে ধরার জন্য, ওর কাছ থেকে একটু বাবা ডাক শোনার জন্য অন্তরটা ব্যথায় ফেটে গেলেও না।
সব কিছু ভেবে কাউকে কিছুই বললো না আল্লারাখা। যাওয়ার আগে শেষ বারের মত নাসিম নেওয়াজের বাগানটা ঘুরে দেখার অযুহাতে দোলনের কবরের পাশে দাড়িয়ে নীরবে অশ্রু সংবরন করে আসলো।
তারপর এখানকার সব পাঠ চুকিয়ে সব গুটিয়ে অল্লারাখা আর খালাকে নিয়ে অন্তরা ফিরে গেল ওদের নিজ বাড়ীতে।

Category: Bangla, Novel

Comment List

Your email address will not be published.