অসহায় মানুষ -৯

 

এর ভিতর সিঙ্গাপুর থেকে সালাম তরফদার দেশে আসলো কয়েকবার। আল্লারাখাকে একবার ঘুরিয়েও আনলো সিংগাপুর থেকে।
সেলিনা সন্তান সম্ভাবা। এ অবস্থায় ওর মনটন একটু ভালো হওয়া দরকার। সালাম তরফদার তায় সেলিনাকে নিয়ে সিংগাপুর বা অন্য কোথাও ঘুরে আসার অনুরোধ করলো।
সরাসরি ওর অনীহার কথা না বললেও শান্ত কন্ঠে ভেবে দেখি বলে জানালো সেলিনা।
সালাম তরফদার তখন দেশে, একদিন একটা ফোন আসলো সিংগাপুর থেকে। সালাম তরফদারের জন্য ফোন। তিনি বাসার বাইরে তখন। আল্লারাখা ফোনটা ধরে ইংরেজী না বুঝতে পেরে সেলিনাকে ডাকলো।
বিদেশিনীর গলা ফোনে।
তিনি যা বললেন তা শুনে ফোনটা রেখে অনেকক্ষন ধরে চুপচাপ বাকরূদ্ধ হয়ে সোফায় বসে রইলো সেলিনা।
সেলিনা মফঃস্বল শহরে মধ্যবিত্ত রক্ষনশীল পরিবারের মেয়ে। স্বামীর অনেক কিছুই ভাল না লাগলেও মুখ বন্ধ করে মেনে নিয়ে নিজেকে একদম গুটিয়ে নিয়েছে।
সিংগাপুরের জীবন- মদ্য পান করা, ক্লাবে খোলামেলা মেশামিশি ইত্যাদি ওর একদম ভালো লাগেনি। সে সমস্ত ব্যাপারে ওর স্বামী কোন ব্যতিক্রম নয়। ওর মত যারা বড় বড় ব্যবসায়ী তাদের সবারই জীবনধারা ওই একই রকম। তায়তো একমাত্র পথ হিসেবে এ সব কিছু থেকে সরে এসেছে সেলিনা।
ও ধরণের জীবনই সেখানে মানানসই। সালামের ওই পরিবেশেই জন্ম তায় ওগুলো ওর কাছে স্বাভাবিক।
সেলিনার ওসব সম্পর্কে অপছন্দের ব্যপারটা বিভিন্ন ভাবে প্রকাশ পাওয়াতে সালামের চোখে মুখে একটা বিরক্তির ভাব লক্ষ করেছে সেলিনা। ও বুঝেছে ওই সমাজে ও বড্ড বেমানান। আর এও বুঝেছে ওসবের সাথে খাপ খায়িয়ে চলা ওর পক্ষে অসম্ভব।
তায়তো তরফদার ভবনে একাকী জীবনটা কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কিন্তু একি শুনলো আজ! স্বামীর জীবনের এ দিকটা ওর একদম জানা ছিল না। এ যে কল্পনারও অতীত। পুরো বিষয়টা গোপন থাকলেই বোধহয় ভালো হতো।
এদেশের সাধারণ ঘরের মেয়েরা স্বামীকে দেবতার সমতুল্য মনে করে। পরোকালে স্বর্গলাভের জন্য স্বামীর সুপারিশ অবশ্ব্য প্রয়োজনীয় বলে বিশ্বাস করে এদেশের স্ত্রীরা। সেলিনা তার ব্যতিক্রম নয়।
কিন্তু আজ দেবতার সে আসন টলায়মান মনে হচ্ছে কেন! তাহলে স্বর্গে যাওয়ার সুপারিশের জন্য কার দারস্থ হবে ও?

জরূরী প্রয়োজনে টিসা সিংগাপুর ছেড়ে দেশে ফেরত যাচ্ছে। সালাম তরফদারের সাথে লিভ-টুগেদারের কন্ট্রক্ট শেষ হতে আরো সপ্তাহ দুই বাকি। তায়তো বিশ্বাসী বন্ধুর মত সততার খাতিরে তা জানিয়ে যেতে চায় সালামকে।
জড়তার কোন লেশ মাত্র ছিল না টিসার কণ্ঠে। এটা স্বাভাবিক একটা ব্যপার ওদের সমাজে।
লিখিত কন্ট্রাক্ট উভয়ের সম্মতিতে। কিন্তু কি তার স্বরূপ! সেটা সেলিনার অজানা।
সেলিনা ভাবে -প্রকৃতপক্ষে সব সম্পর্কইতো এক একটা কন্ট্রাক্ট। সালামের সাথে সেলিনার বিয়েটাওতো একটা কন্ট্রাক্ট। পার্থক্য শুধু শেষ হওয়ার তারিখ নিয়ে।
ওদের কন্ট্রাক্ট শেষ হওয়ারতো কোন তারিখ দেয়া নেই। এতো শেষ হওয়ার নয়!
নিজের পেটে হাত বুলিয়ে ওদের অনাগত সন্তানকে অনুভব করার চেষ্টা করলো সেলিনা।

একটু বাদে ফিরলো সালাম। ভিতিরে প্রবেশের আগেই আল্লারাখাই খবর দিল টিসার টেলিফোন করার ব্যপারে। সেলিনা যে কথা বলেছে ওর সাথে তাও বললো।
পাশের একটা সোফায় বসে সেলিনা। সালাম তাকালো ওর দিকে।
সেলিনা নির্লিপ্তে অন্য দিকে তাকিয়ে টিসার চলে যাওয়ার খবরটা দিল ওকে।
তারপর তাকালো সালামের চোখে। কোন সংশয় বা অপরাধ বোধ ফুটে উঠেছে কিনা দেখার জন্য।
কোন পরিবর্তনই দেখল না ওর মুখাবয়বে।
বুঝলো সালামের সাথে ওর মনের পার্থক্য সুদূর পরাহত। ভিন্ন মেরূর মানুষ ওরা।

সিংগাপুর ফিরে গেল সালাম তরফদার। এবার ওদের মধ্যকার বিরাজমান দূরত্ব আরো শত সহস্রগুণ বেড়ে গেল। সালামের টেলিফোন ধরাও বন্ধ করে দিল সেলিনা।
এমনই সময় জন্ম নিল অন্তরা।
খুশী হয়ে ছুটে আসলো সালাম তরফদার।
সালামের হাজারো অনুরোধ সত্ত্বেও অন্তরাকে নিয়ে সিংগাপুর গেল না সেলিনা। আবেগহীন কণ্ঠে সে সেলিনা জানালো –সে নিজে আর কখনও ওখানে যাবে না আর মেয়ে বড় হলে ওকেও নিষেধ করবে, তারপরও মেয়ে যেতে চায়লে তার কোন আপত্তি করবে না বলেও জানিয়ে দিল।

সিংগাপুরের সব ব্যবসা গুটিয়ে দেশে চলে আসবে কিনা তা জানতে চায়লো সালাম স্ত্রীর কাছ থেকে।
-কি হবে এখন ফিরে!
কোন আবেগ ছিল না সেলিনার কণ্ঠে।
অন্তরা বড় হতে লাগলো। ব্যবসা গুটিয়ে না আনলেও আগের থেকে বেশী বেশী করে দেশে আসতে লাগলো সালাম তালুকদার।
অন্তরার কোন চাহিদাই তিনি অপুরণীয় রাখলেন না।

 

সন্তান সম্ভাবা স্ত্রী দোলনকে ওভাবে বাড়ী থেকে বের করে দেবার কিছুদিন পর থেকে আল্লারাখা ধীরে ধীরে একেবারে উদভ্রান্তের মত হয়ে জেতে লাগলো। নিচক সন্দেহের উপর ভিত্তি করে ঘটে যাওয়া এতবড় একটা ব্যপার কাউকেই বলতে পারলো না।
সব সময়ে অন্যমনষ্ক থাকে আল্লারাখা, চুল কাটে না, দাড়ি গোফ কামায় না, কথাও বলে না খুব একটা। মাথা নিচু করে সব কথার জবাব দেয়।
সেলিনা ধীরে ধীরে খেয়াল করলো ব্যপারটা।
একদিন ডেকে কাছে বসালো ওকে সেলিনা।

অনেক বুঝানোর পর সব খুলে বললো আল্লারাখা।
-তুই এ কি করেচিস হতভাগা? তোরতো মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে।
-অমন কাজ করলে মাথা খারাপ না হয়ে পারে?
হাসলো একটু সেলিনা।
-হায়রে অপদার্থ, সুন্দরী বউয়ের প্রতি তোর আকর্ষন তোকেতো মাতাল বানিয়ে দিয়েছে।
-আমি মাতাল না।
গোমরা মুখ করে জবাব দিল আল্লারাখা।
-ধর তোকে একটা ঝলমলে মুক্তোর মালা দেয়া হলো। সেটা পেয়ে তুইতো আত্মহারা হয়ে যাবি। তখন জেগে জেগে আর কল্পনায় মনে হবে দুনিয়াশুদ্ধ মানুষ সব কাজ ফেলে কেবল তোর মুক্তোর মালাটা ছিনিয়ে নেয়ার জন্য চেষ্টা করছে। বানর কোথাকার।
সেলিনার কথা শুনে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো আল্লারাখা।
-দোলনের প্রতি তোর ভালবাসা এত প্রবল যে এক মুহুর্তের জন্যও ওকে চোখের আড়াল করতে চাস না তুই। বাতাসকেও তোর সন্দেহ, তায়তো বউটাকে ঘরের বাইরে পর্যন্ত বেরূতে দিস না।
আল্লারাখা তেমনি তাকিয়ে রইলো। ওর ভুলটা ভেঙেছে বলে মনে হলো। কিন্তু ওর সুন্দরী স্ত্রী সম্পর্কে যে অমুলক সন্দেহ এবং তার উপর ভিত্তি করে ওযে এতদিন ধরে দোলনকে বাইরের মুক্ত আলো বাতাস এমনকি ওর মা বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত করেছে তার জন্য কোন অপরাধবোধের ছায়া ওর মুখের উপর ভেষে উঠতে দেখা গেল না।
নিজের চিন্তা আর নিজের ভাললাগা কে নিয়েই মশগুল আল্লারাখা।
-একি ভালবাসা না কোন মহামুল্যবান বস্তুকে পাহারা দিয়ে রাখা!
ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ছাড়লো সেলিনা।
-অমনভাবে তাকিয়ে কি দেখচিস হতভাগা, যা তাড়াতাড়ি শশুর বাড়ীতে গিয়ে দেখ ছেলে না মেয়ে হয়েছে। নিয়ে আয় ওদের।
একটা ধাক্কা খেয়ে ভুল ভাঙলো ওর। আল্লারাখা একটুও অপেক্ষা না করে বউকে আনার জন্য চলে গেল।

কিন্তু দোলনতো ওর বাবা মার কাছে যায়নি। জমিরকে খুজে বের করলো আল্লারাখা আর ওর কাছ থেকেই শুনলো সব।
জমিরের কাছে ওর ভুল স্বীকার করে ওকে নিয়েই রাজধানী শহরের বস্তির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো।
ওই বস্তিতে আশ্রয় নেয়া ওদের গ্রামের একজনের বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছিল দোলন।
সেখানে পৌছে দেখলো বস্তির কোন নিশানা নেই। সরকারী বুলডোজার সব ভেঙ্গে উচ্ছেদ করেছে। বস্তিবাসীরা যে যার মত চলে গিয়েছে।
এত বড় অচেনা শহরে কোথায় খুজবে দোলনকে। কতজনের কাছে জিজ্ঞেস করলো। কিন্তু দোলনের কোন হদিস করতে পারলো না।
জমিরকে ফিরে যেতে বললো আল্লারাখা। ও দোলনকে খুজে বের না করে যাবে না বলে জানালো।
জমির ওকে ছেড়ে আসলো না। বেশ কিছুদিন ধরে খোজাখুজি করার পর দোলনের কোন খোজ না পেয়ে জমির একরকম জোর করেই আল্লারাখাকে নিয়ে ফিরে আসলো।

অনেক কিছু বলে শান্তনা দিল সেলিনা। ওর যা অবস্থা, কখন কি ঘটিয়ে বসে তায় ওকে ফলোয়ারস কোয়াটার থেকে নিয়ে এসে মুল মহলে থাকার ব্যবস্থা করলো।

Category: Novel

Comment List

Your email address will not be published.