এক দম্পত্তির হৃদয় ভাঙ্গার গল্প

 

(সংকলিত)

 

বিধাতার কাছে লাগাতার প্রার্থনার করে করে অবশেষে বিয়ের এগারো বছরের মাথায় ওই দম্পতির একটি ছেলে সন্তান জন্ম গ্রহন  করলো। তাদের দাম্পত্য জীবন ছিল খুবই ভালবাসার এবং অনেক  প্রার্থনার ফসল হিসেবে পাওয়া ছেলেটি তাদের চোখের মনি হয়ে উঠলো।

ছেলেটির বয়স তখন দুই বছর। নিয়ম মাফিক একদিন সকালে  অফিস যাওয়ার সময় লোকটি লক্ষ্য করলো যে টুলের উপর একটি ওষুধের বোতল খোলা অবস্থায় রাখা আছে। সেদিন সে একটু তাড়াহুড়ার মধ্যে থাকাই রান্না ঘরে কর্মরত স্ত্রীকে বোতলটির মুখ বন্দ করে আলমারিটিতে উঠিয়ে রাখার কথা বলে অফিসে বেরিয়ে পড়লো। রান্নাঘরে ব্যস্ত থাকায় স্ত্রী বিষয়টি পুরোপুরি ভুলে গেল।

কিছুক্ষন পর বোতলটি খেলায় রত তাদের দু বছরের ছেলেটির   নজরে পড়লো। বোতলের আকর্ষণীয় রং ছোট্ট ছেলেটিকে মুগ্ধ করলো এবং খেলার ছলে বোতল থেকে সব ঔষধ সে ঢক ঢক করে খেয়ে ফেললো।

দুর্ভাগ্যবশত সেটি এক ধরনের বিষাক্ত ঔষধ ছিল যা প্রাপ্ত বয়স্ক দের জন্য খুব অল্প করে খাওয়ার নির্দেশ ছিল।

পুরো ঔষধ খেয়ে শিশুটি মাটিতে লুটিয়ে পড়লো, তা দেখে তার মা ছুটে আসলো এবং ছেলেকে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে গেল। কিন্তু দুঃখের বিষয় সেখানেই শিশুটি মারা গেল।

আকস্মিক দুর্ঘটনার প্রেক্ষিতে মা হতবাক হয়ে গেল; একদিকে অনেক আকাঙ্ক্ষিত সন্তান হারানোর বেদনা অন্য দিকে তার স্বামীর মনে করিয়ে দেয়া সত্ত্বেও ঔষধের বোতলের মুখ লাগিয়ে তা সরিয়ে রাখতে ভুলের কারনে এত বড় দুর্ঘটনা কথাটি ভেবে মা নিজেকে  দায়ী করে কীভাবে তার স্বামীর মুখোমুখি হবে সে বিষয় চিন্তা করে আতংকিত ও স্তম্ভিত হয়ে রইলো।

দুঃখে ভারাক্রান্ত বাবা হাসপাতালে এসে মৃত শিশুটি দেখল আর পাশে পাথরের মত উপবিষ্ট তার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে দেখল। সব বিবেচনা করে সন্তান হারানো বাবা শোকে কাতর স্ত্রী প্রতি মাত্র চারটি শব্দ উচ্চারণ করলো।

এই চারটি শব্দ কী ছিল বলে আপনি মনে করেন?

স্বামী ওভাবে সব হারিয়ে অসাড় হয়ে বসে থাকা স্ত্রীকে কেবল বললো, “আমি  তোমাকে ভালবাসি সোনা।”

তার একমাত্র সন্তান হারানোর শোকে মুহ্যমান লোকটি অপ্রত্যাশিত ভাবে ঠাণ্ডা মাথায় এই সুদূরপ্রসারী আচরণ করলো।

তাদের একমাত্র সন্তান মারা গিয়েছে যাকে কখনই জীবিত অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যাবে না। তার স্ত্রী সেও তার সন্তান হারিয়েছে, এ মুহূর্তে দোষ খুঁজে বের করে কোনও লাভ হবে না। যদিও তার স্ত্রী তার অনুরোধ মত বোতলটি সরিয়ে ফেললে হয়তো দুর্ঘটনাটা এড়ানো যেত।

এ মুহূর্তে শোকে কাতর মায়ের দোষ বের করার কোন মানে নেই। মাও তার একমাত্র সন্তানকে হারিয়েছিলেন। এই মুহুর্তে সন্তান হারা মায়ের যা দরকার ছিল তা হল স্বামীর কাছ থেকে সান্ত্বনা এবং সহানুভূতি। সেটাই লোকটি তার স্ত্রীকে দিলো।

পরিবারের মধ্যে হোক বা চাকুরী ক্ষেত্রে বা অন্য কোন সামাজিক অঙ্গনে হোক কোন ঘটনা ঘটলে তার জন্য আমরা কাকে দোষী  সাব্যস্ত করা যাই সেটা নির্ধারণের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ি। যার ফলে দুর্ঘটনা কালে একে অপরকে সাহায্য ও সহযোগিতা করে পারস্পরিক ভাল সম্পরকের যে প্রশান্তি লাভ করা যায় আমরা তা থেকে নিজেদেরকে বঞ্চিত করি।

সর্বোপরি, আমরা যাকে ভালোবাসি তাকে ক্ষমা করা উচিত নয় কি? এবং যেটা করা পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ জিনিস।

আমাদের যার যেটুকু ভালবাসার বা ভাললাগার জায়গা আছে সবাইকে সেটুকু সুরক্ষা করতে হবে। যন্ত্রণা, কষ্ট কমবেশি সবার জীবনেই আছে ও থাকবে, অযথা অযৌক্তিক ভাবে সেগুলো বৃদ্ধি করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

আমাদের মনে লালিত সমস্ত ইর্ষা, হিংসা, ক্ষমা করতে অনিচ্ছুকতা,  স্বার্থপরতা এবং সর্বোপরি অজানা ভয়কে জয় করতে হবে, তাহলেই  আমরা বুঝতে পারবো যে পৃথিবীটা অত কষ্টের জায়গা নয় যা সবাই বলে থাকে।

এই ধরণের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে জীবনকে দেখলে পরিবারে, সমাজে ও  বিশ্বে সমস্যা অনেক কম যাবে। বিশ্ব আরো সুন্দর ও সুখময় হয়ে উঠবে।

Category: Bangla, Moral Stories

Comment List

Your email address will not be published.