দৈবক্রম -১৬ 

 

 

জামিলের কথায় বোঝা যায় ওর আপনজনরা সব দুজন দুজন করে। যেমন বড়দাদু, ছোটদাদু, বড়দাদিম্‌ ছোটদাদিমা, বড়পাপা ছোটপাপা ইত্যাদি। কেবল মায়ের বেলায় ছোট বড় নেই।

কথায় কথায় জামিল একদিন বললো ওর মা মরে গিয়েছে, কিন্তু ছোট দাদিমা বলেছে ওর আর একটা মা হবে। সে ওকে খুব ভালো বাসবে আদর করবে গল্প বলে ঘুম পাড়াবে।

-তাহলে আরিফের প্রথম স্ত্রী মারা গিয়েছে! কথাটা ভেবে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসলো অনন্যার বুক খালি করে।

-ঠিক আছে এমন একটা দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে যে কোন কারো ক্ষেত্রে। কিন্তু বিয়ের সময় ওরা ব্যপারটা গোপন কেন করলো! আর আরিফ! কত কথা বললো ওই চার দিনে কিন্তু একটি বারের জন্যও এ বিষয়ে কিছুই উল্লেখ করলো না। ও অনন্যাকে বিশ্বাস করে সত্য কথাটা বলেই দেখতো।

অভিমানে মনটা ভারী হলো অনন্যার।

-আরিফকে বিয়ে দিয়েছে এ ব্যপারটা বিয়ের বেশ কিছু দিন পর শহিদ সরকার টেলিফোনে জানিয়েছিল। জামিল প্রসঙ্গে কথার ফাকে একদিন কথাটা বললেন নাজমা বেগম।

নাজমা বেগম আরো জানালেন যে -আরিফ দ্বিতীয় বিয়ে না করার ব্যপারে অনেক দিন পর্যন্ত অনড় ছিল। ও বলেছিল প্রথম বিয়েটাতো বাবা মার ইচ্ছাতেই হয়েছিল। তারপর যা হবার তাতো হলো তাহলে আবার বিয়ে কেন।

-জামিলকে নিয়েই জীবনটা কাটাতে চেয়েছিল ও। শব্দ করে একটা নিঃশ্বাস ছাড়লেন নাজমা বেগম।

-জামিলকে একটুও চোখের আড়াল করতে চায়নি আরিফ। কিন্তু আমাদের জোরাজোরি আর সর্বপরি জামিলের ভাল লেখাপড়া, উন্নত ভবিষ্যৎ ইত্যদি কথা চিন্ত করে ওরা জামিলকে পাঠাতে রাজি হলো। 

-জামিলকে পাঠানোর কয়েক বছর পর আরিফ বিশেষ করে ওর মায়ের কান্নাকাটিতেই পুনরায় বিয়ে করতে রাজি হয়েছিল। আরিফের বিয়েটা ওদের কারো কাছে আর বিশেষ করে আরিফের কাছে ছিল নিতান্তই গতানুগতিক ঘটনা বই কিছু না। তায়তো কাউকেই জানায়নি ওরা।

-আমরাও জানলাম পরে ওর বিয়েটা যখন ভেঙে গেল।

একটু থামলেন নাজমা বেগম। কি যেন একটা ভাবলেন।

-তোমাকে বলতে কি মা, তুমিতো আমাদের পরিবারের সদস্যের মত। শুনেছি বিয়ের আয়োজনটা অনেকটা আরিফের শাশুড়ির জোরাজোরিতেই তাড়াহুড়া করে করা হয়েছিল। আবার অজানা কারণে কয়েকদিনের মধ্যেই বিয়েটা ভেঙে যায়। তারপর একটা সন্তান জন্ম দেয়ার পর পরই ওর স্ত্রী আরিফকে তালাক দিয়ে চলে যায়। 

-তালাক দিয়েছে!

অন্যমনোস্ক ভাবে কথাটা বলেই নিজেকে সামলে নিল অনন্যা।

নাজমা বেগম খেয়াল করলেন না অতটা। ঘটনা বর্ণনা করতে করতে নাজমা বেগমও কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন।

-তালাকটা কি জন্য দিল তার কোন কিছুই জানায়নি ওরা। সে বড় অবাক করা কান্ড। তার থেকে আরো অবাক করা কান্ড হচ্ছে নিজ গর্ভের শিশুকে ফেলে একজন মা কি ভাবে চলে যেতে পারে। রাগ ক্ষোভ বা অভিমানে অন্য সব কিছু করতে পারলেও দুধের বাচ্চা ফেলে একজন মা কি ভাবে চলে আসতে পারে! আরিফ দোষ করলেও করতে পারে যদিও সে জানেনা তার দোষের কথা কিন্তু বাচ্চাটা কি দোষ করেছিল মায়ের কাছে!

একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসলো নাজমা বেগমের বুক স্ফিত করে।

-মেয়েটা প্রথম কিছুদিন আরিফের মায়ের কাছে ছিল তারপর আরিফ নাকি ওকে নিয়ে নিজের কাছে রাখে। কখনও ওর মা আবার কখনও ওর এক খালাকে নিয়ে রাখে। দেখ মা  ভাগ্যের কি পরিহাস; দুধের ছেলেকে রেখে ওর প্রথম স্ত্রী মারা গেল, তারপর শিশু মেয়েকে রেখে ওর দ্বিতিয় স্ত্রীও অজানা কারনে ওকে ছেড়ে চলে গেল। এখন ওর ছেলে জামিল আমাদের কাছে আর মা হারা শিশু মেয়েটা আরিফের কাছে। কি পেল আরিফ ওর জীবনে!  

শাড়ির আচলে চোখ মুছলেন নাজমা বেগম।

-আমিতো বুঝি আরিফ কত কষ্টে এই সোনার মত ছেলে জামিলকে দূরে রেখেছে।

নাজমা বেগম আর শাহেদ সরকারের কথায় পরিস্কার বোঝা যায় আরিফ ছেলেকে খুব ভালবাসে। ওদের কথায় জামিলকে ওদের কাছে পাঠানো আরিফের ত্যাগ স্বীকারের এক বিরল দৃষ্টান্ত।

সব কিছু কেমন যেন গড়মিল লাগলো অনন্যার কাছে।

-ছেলেকে এত দূরে পাঠিয়ে দিয়ে নিজের প্রবল অনিচ্ছা সত্বেও আবার বিয়ে করা!

ব্যপারগুলো অনন্যাকে কিছুটা হতবিহবল করে দিল।

শাহেদ সরকার আর ওর স্ত্রী সেদিন নাস্তার পর বাইরে গেলেন। জামিল স্কুলে। বাড়ীতে কেবল ষোল সতেরো বছর বয়সী কাজের ছেলে বাবলু।

টেলিফোন বাজলো। ধরবে কিনা ভাবছিল অনন্যা। এমন সময় বাবলু উঠালো টেলিফোনটা।

ও ছোট দাদি ছোট দাদি বলে সন্মধন করলো টেলিফোনে। মিসেস নাজমাকে ও বড় দাদি বলে। তাহলে কি টেলিফোনের ওধারে আরিফের মা!

তাকে ভাল করে দেখেনি অনন্যা। বিয়ের আগে এসেছিলেন একবার। অনন্যা দেশ ছেড়ে আসার পর তিনিই এসে ভাবনাকে নিয়ে গিয়েছে ওদের বাড়ী থেকে।

-জামিল ভাইয়া খুব ভাল আাছে, নতুন খালাম্মার কাছে থাকে ও।

অনন্যা বুঝলো ওরই কথা বলছে বাবলু। ভাবনা আপু বড় হইছে, এক পা দুপা হাটে! ঠিক  আছে আমি বড় দাদিকে বলবো।

ভাবনার নামটা শুনতেই আনন্যা ব্যকুল হয়ে উঠলো। মনে হলো টেলিফোনটা নিয়ে নিজেই কথা বলুক।

অনেক কষ্টে নিজেকে সামলালো অনন্যা।

কেউ বাসায় নেই আসলে সব জানাবে বলে টেলিফোন রাখলো বাবলু।

নিজেকে সামলে নিয়ে কথার কথা জিজ্ঞেস করার মত করে অনন্যা জিজ্ঞেস করলো বাবলুকে –টেলিফোন কে করেছিল বাবলু?

মনে হলো বাবলু আত্মজাহির করার একটা সুযোগ পেল।

-ছোট দাদি মানে জামিল ভাইয়ার দাদি। খুব ভাল মানুষ নাইলে এই বয়সে ওদিকে একটা দুধের বাচ্চা পালতিছে আবার এই দিকে সবসময় টেলিফোনে জামিল ভাইয়ার খোজখবর রাখতিছে।

-বুঝলেন খালাম্মা উনার কপালডায় খারাপ। বড় ছেলেডারে অকালে হারাইলো। ছোড ছেলেডা মানি আরিফ চাচাজানতো ভাইর জন্য বলতি গিলি পাগল ছিল। দেখতিও দুভাই শুনছি একই রকম, মনে হইতো জান একটা, শুধু শরীল দুইটা। ভাই হারায়ে তার কি দশা। 

-তারপর বিয়ে করবে না করবে না করে যদিও বিয়েডা করলো হের বউডা একটা মেয়ের জন্ম দিয়েই তালাক দিয়ে চলে গেল। হায়রে কপাল! তায় বলি আরিফ চাচাজানরে যে মহিলায় দোষ দেয় আমি বলি হের নিজেরই দোষ আছে। সব কথা না হয় বাদই দিলাম কিন্তু তিনি ভাল হলি ওরাম দুধির বাচ্চা রাখে যাতি পারে?

কলিং বেলটা বেজে উঠলো।

-বড়দাদি আসছে বোধহয়।

বাবলু দরজা খুলতে গেল।

Category: Bangla, Novel

Comment List

Your email address will not be published.