দ্বীপবাসী

পড়ন্ত বিকেলে জমিদার চৌধুরী তার কাচারিঘরের সামনের ছাদওয়ালা প্রশস্ত বারান্দার উপর একটা ইজি চেয়ারে গাটা এলিয়ে দিয়েছেন।

দেয়াল ঘেরা বিশাল চৌধুরী বাড়ীটার মূল ফটকটা দক্ষিন দিকে আর তার সামনেই খোলা মাঠ যেখানে এক সময় ঘোড় দৌড় অনুষ্ঠিত হতো। তার দক্ষিনে উচু পাড় ওয়ালা মস্ত বড় দীঘি। সেটারই উঁচু পাড়ের উপর নির্মিত চারিদিক উচু বারান্দাওয়ালা মস্ত বড় কাচারিঘর। তারই সামনে লম্বা লম্বা সিড়ি দিয়ে বাধানো  দীঘির ঘাট।

বর্ষাটা এবার একটু আগে ভাগেই শুরু হয়েছে। অতি বর্ষনের সম্ভাবনা আছে বলে আবহাওয়া পরিদপ্তর

জানিয়েছে। ফলোশ্রুতিতে বন্যার সম্ভাবনায়ও এলাকা বাসী সকলে কমবেশী শঙ্কিত।

দুশো বছরেরও বেশী পুরোনো চৌধুরী পরিবার। প্রায় পঁঞ্চাশ একর জায়গা জুড়ে নির্মিত বসত বাড়ী। এ বংশের পিতৃপুরুষ প্রথম চৌধুরী দুশো বছর পূর্বে বাড়ীটি নির্মান করলেও পরবর্তি বংশধররা তাতে আধুনিকতার যুগোপযোগী ছোয়া লাগিয়ে এ বাড়ীর ঈট পাথর গাছ গাছালি ইত্যাদিকে কোন ঐতিহ্য ধরে রাখার নামে কোথাও ঘড়ির কাটা থামিয়ে দেয়নি।

মস্তবড় ইমারত, এর এক কোনে যেমন মুঘল আমলের ঝাড়বাতি জ্বলে তেমনি অন্য কোনে ঈটালিয়ান, গ্রীক, তুরস্ক ইত্যাদি দেশ থেকে আনা বিভিন্ন সরঞ্জামের সমারোহ অতীত বর্তমান, প্রাচ্য পাশ্চাত্যকে পাশাপাশি দাড় করিয়ে এক অভূতপূর্ব সেতুবন্ধন তৈরী করেছে। বাইরেটা শত বছরের পুরনো কিন্তু আধুনিকতার ছাপে তা জীবন্ত আর ভিতরটা অতীতের সাথে আধুনিকতার অপরুপ সখ্যতা।

এই সখ্যতার ছাপ শুধুমাত্র ইমারতেই নয় বাইরে বিশাল বাগানেও প্রতিভাত।

গাছ গাছালিতে ভর্তি চৌধুরী এস্টেট। চারিদিকে তাকালে যেমন দেখা যায় শত বছরের পুরনো শাল শেগুন বট আর তেতুল যা ওদের পিতৃ পুরুষের সাক্ষ্য বহন করছে তেমনি আবার আছে দেশী ও আফ্রিকান মেহেগুনি সহ শঙ্করজাতীয় আম জাম কাঠালের সমারোহ।

চৌধুরী পরিবার ছাড়াও ঐ আঙিনায় বংশ পরস্পর বাস করে আরো দুটো পরিবার। এই বংশের পিতৃপুরুষের আমল থেকেই ওদের বসবাস।

জমিজমা ও অন্যান্য সম্পত্তি দেখাশোনার জন্য প্রথম চৌধুরী একজন নায়েব আর এই ঘরবাড়ীর ও বসতবাড়ী সংলগ্ন গাছগাছালি পরিচর্জার জন্য একজন কৃষক পরিবারের জন্য মূল বাড়ী থেকে একটু দুরে দুটো পৃক বসতবাড়ী তৈরী করেছিলেন। তিনি লিখিতভাবে ঐ দুটি পরিবারের জন্য এমন ব্যবস্থা করেছেন যে ওরা যতদিন চৌধুরী বাড়ীতে কাজ করবে ততোদিন পরিবার সহ বিনা ভাড়ায় ঐ বাড়ীতে থাকতে পারবে। তবে কখনও ওদের কেউ চৌধুরী বাড়ীর কোন জমি জাইগা ক্রয় বা দান সুত্রেও এর মালিক হতে পারবে না।

দুটো পরিবারের কেউই এ অঞ্চলের বাসিন্দা নয়। সে আমলে প্রথম চৌধুরী ওদেরকে আসাম থেকে নিয়ে এসেছিল।

দুটি পরিবারই বংশ পরস্পর এই চৌধুরী পরিবার আর এর সম্পত্তির সাথে জড়িত। নির্ধারিত হারে বেতন পাওয়া ছাড়াও এই বসত বাড়ী সংলগ্ন সম্পতি থেকে উদপাদিত ফসল আর ফলফলাদি ওরা বিনা পয়সায় ভোগ করে। বলতে গেলে পরিবার দুটোর খাওয়া পরার জন্য ওদের প্রাপ্ত বেতনের কিয়াদংশ ব্যয় করলেই যথেষ্ঠ।

প্রথম চৌধুরী আর একটা উইল করেছেন- জমিদারীর অন্যান্য সকল সম্পত্তি সকলের মধ্যে নিয়ম অনুযায়ী ভাগাভাগী হলেও চৌধুরী এস্টেট কখনো ভাগ হবে না। এটা বিভাজন যোগ্য না। চৌধুরী বংশের বড় সন্তান এর মালিক হবে এবং তার উপর এর রক্ষনা বেক্ষনের ভার থাকবে। তবে অন্যান্য সকলে এটা ভোগ করতে পারবে।

প্রথম চৌধুরীর দূরদর্শিতা সম্পর্কে প্রকৃতই কারো কোন প্রশ্ন নেই। অত আগে তিনি কি চিন্তা করে মূল চৌধুরী বাড়ীটা সহ নায়েব আর গৃহস্থের দুটি বাড়ীও ছোট খাট পাহাড়ের মত তৈরী করে তার উপরেই বানিয়েছেন।

ফলোশ্রুতিতে বসত বাড়ির ভিতরে বেশ কয়েকটা ছোট বড় দীঘিরও সৃষ্টি হয়েছে।

দেশ বিদেশ অনেক ঘুরে প্রায় বৃদ্ধ বয়সে বর্তমান চৌধুরী এই ভিটা বাড়ীতে ফেরত এসেছেন বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেয়ার ইচ্ছে নিয়ে।

পঁঞ্চম পুরুষের সদস্য বর্তমান চৌধুরী পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে জৈষ্ঠ। চৌধুরীর অন্যান্য ভাই বোন আর ওদের সন্তানেরা সবাই বাইরে। কেউ বা দেশের ভিতরে আবার কেউবা বাইরে।

বর্তমান চৌধুরীর এক ছেলে দুই মেয়ে। সবাই দেশের বাইরে।

বড় মেয়েটা ডাক্তার, স্বামী সংসার নিয়ে থাকে লন্ডনে। ছোট মেয়েটা ওদেরই হেফাযতে লন্ডনে পড়াশোনা করছে। ছেলেটা মেডিক্যাল সায়েন্স নিয়ে পড়ছে অষ্ট্রেলিয়াতে। আরো বছর দুয়েক লাগবে শেষ করতে।

চৌধুরী সাহেবের স্ত্রী বড় একজন আমলা, বর্তমানে রাজধানীতে পোষ্টিং। সেখানেই সরকারী বাসায় অবস্থান করছেন। প্রায় পঁয়ত্রিশ বছরের বিবাহিত জীবনের প্রথম বছর পাঁচেক বাদে বাকি সময়টা ওদের বলতে গেলে পৃথক ভাবেই কাটাতে হয়েছে। দুজনেরই সরকারী চাকরী একই ষ্টেশানে পোষ্টিং সম্ভব হয়নি।

সরকারী চাকরী ছেড়ে গত প্রায় দশ বছর যাবত সুদূর আমেরিকায় অবস্থান করার পর বছর খানেক হলো বাড়ী ফিরেছে চৌধুরী।

-স্যার চা’ টা কিছু দিতে বলবো।

রামদয়ালের ডাকে সম্বিত ফিরে পেয়ে একটু অবাকই হল চৌধুরী। প্রথমতঃ সকালে নাস্তার সাথে চা খেয়েই কিছুক্ষন আগে এখানে এসে বসেছেন। অতএব চায়ের তৃষ্ণা নেই। তার উপর রামদয়াল মানে চৌধুরী বাড়ীর কৃষক আমাকে চা খাওয়ার কথা বলাটা একদম অপ্রাসঙ্গিক।

-বোধহয় কিছু একটা বলতে চায় ও। অনুমান করার চেষ্টা করলাম।

প্রতিদিন সকালে প্রায় জন পঁঞ্চাশেক লোককে রামদয়াল প্রধান গেট দিয়ে ভিতরে নিয়ে আসে কাজ করার জন্য। ওদের অর্ধেকের মত রামদয়ালের পার্মানেণ্ট লোক যারা কলের নাঙ্গোলের ড্রাইভার, বিভিন্ন গাছের বা দীঘিগুলোর পরিচর্যাকারী ইত্যাদি। আর বাকিদেরকে ও প্রয়োজন অনুযায়ী নেয়। ওর কাছে ওরাও সব পুরনো মুখ। সকলকেই রামদয়াল নামে চেনে। ওদের মধ্যে কিছু লোককে রামদয়াল সাপ্তাহিক হারে আর বাকিদের দৈনিক হারে পেমেণ্ট করে। এদেরকে পরিচালনা করতেই ওর দিন ফুরিয়ে যায়।

বৃষ্টির জন্য গত প্রায় সপ্তাহ খানেক বলতে গেলে সব কাজ বন্দ। ভাবলাম হাতে কাজ নেই তায় বোধহয় ও এসেছে কোন কথাটতা বলার জন্য।

কয়েকদিন ধরেই অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছে, থামার কোন লক্ষনই নেই।

চায়ের ব্যাপারে কিছু না বলে ওকে বসতে বললাম।

রামদয়াল টোকাটা মাথা থেকে খুলে রেখে বারান্দায় উঠে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসলো।

বাড়ীর লোকজন কথা বলতে আসলে সাধারণত ওভাবেই বারান্দার মেঝেতে হেলান দিয়ে বসে। এরা বিশ্বস্ত সবাই। ওদেরও যেমন এই সম্পত্তির উপার্জন থেকে ছেলে মেয়ে সংসার নিয়ে খাওয়া পরার কোন সমস্যা হয়না। তেমনি ছোট খাট লোভ লালসা চরিতার্থ করা ছাড়া ওদের কাছ থেকে বড় ধরণের কোন সমস্যার আশংকা চৌধুরীদের নেই।

রামদয়াল বাইরের লোক হওয়াই এখানকার মানুষদের সাথে কাজের সম্পকের্র বাইরে সামাজিক কোন সম্পর্ক নেই বললেই চলে।

-স্যার আমার আগের বউটা দুদিন হলো এসেছে।

রামদয়ালের আগের বউটা মধুপুরের গারো উপজাতি এলাকার বাসিন্দা। বেশ কয়েকজন ছেলেমেয়ে আছে ও ঘরে। বউটা সবাইকে ছেড়ে এখানে এসে ওর সাথে থাকতে চায় না। মাঝে মধ্যে যাতায়াত করে।

রামদয়াল অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করেছে। দ্বিতীয় পক্ষের দুটো ছেলে আর একটা মেয়ে। ওর দ্বিতীয় বউটা গার্মেনটস ফ্যাক্টরীতে চাকরী করে। এ পক্ষের ছেলে দুটোর মধ্যে প্রথমটা এক সাহেবের বাসায় কাজ করতো। ও ছোট বয়স থেকে তার সাথে বাইরে বাইরে থাকতে থাকতে এখন রাজধানী শহরে একটা গাড়ীর গ্যারেজে কাজ নিয়েছে। পরের ছেলেটা পোর্টে এক জাহাজ কোম্পানীতে কাজ করে ওখানেই থাকে। আর মেয়েটা ওর মায়ের সাথে গার্মেণ্টস ফ্যাক্টরীতে কাজ করতে করতে ঐ ফ্যাক্টরীতে কাজ করা একটা ছেলের সাথে ওর মা বিয়ে দিয়েছে। মা আর মেয়ে জামাই ওরা ফ্যাক্টরীর পাশে একটা বাসা ভাড়া করে থাকে। মালিকের ছেলে ওদেরকে নাকি নেক নজরে দেখে আর বছর খানেক হলো মালিকের ছেলেকে ধরে ওর মা জামাইকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়েছে। টাকা পয়সা নাকি মালিকের ছেলেই যোগাড় করে দিয়েছে।

রামদয়াল একাই থাকে। নির্ঝঞ্জাট।

ওর প্রথম পক্ষের বউ ছেলেমেয়েদের জন্যও ওর কিছুই করতে হয় না। কিন্তু বর্তমানে ওর প্রথম বউটা এসেছে অন্যরকম একটা সমস্যা নিয়ে। যা বলার জন্যই রামদয়ালের বর্তমান চৌধুরীর কাছে আসা।

একটু সোজা হয়ে বসলাম। জানি বেচারা একদম একা। ওর পূর্ব পুরুষেরা আপনজনদের ছেড়ে আসার পর থেকে ওরা বংশ পরস্পর এই জায়গাকে এই জায়গার মানুষকে আপন করতে চেয়েছে। মাটি আবহাওয়া সব কিছুকে আপন করতে পারলেও ওর বাইরের গঠনটা কোনক্রমেই মিলানো যায়নি।

ওর কথা বার্তা আচার ব্যবহার চিন্তা চেতনা সব কিছুই এখানকার মত। কিন্তু ওর চেহারার দিকে তাকালে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে ও এখানকার কেউ না। ও যখন আপনমনে বসে থাকে তখন ওকে খুবই অসহায় আর একাকী দলছুট এক জীবের মত মনে হয়।

রামদয়াল বসতে বসতেই নায়েব সদানন্দ আসলো।

অকাল বর্ষনই ওদেরকে কাজ ছাড়া করে পানির মাছকে যেন ডাঙায় তুলে দিয়েছে।

সদানন্দও বসলো রামদয়ালের পাশে।

রামদয়ালের সাথে সদানন্দের সবকিছুতেই মিল। সেও রামদয়ালের মত কক্ষচ্যুত চাক্ষুসভাবে ভীনঅঞ্চলের মানুষ।

কিন্তু ও লেখাপড়া জানা সচেতন মানুষ। অনেক হিসেবী এবং দূরদৃষ্টি সম্পন্ন। সত্যি বলতে হিসেব করাই ওর পেশা।

সদানন্দ নিজে চাক্ষুস ভীনদেশী হলেও তার প্রভাব সে ওর পরবর্তি বংশধরদের মধ্যে বিস্তারলাভ করতে দেয়নি। সদানন্দ এ অঞ্চলের অতি দরিদ্র একটা মেয়েকে বিয়ে করেছে। তাছাড়া ও আশে পাশে কিছু জমিজমাও ক্রয় করেছে। ছেলে মেয়েদের সবাইকেই সাধ্যমত যৎসামান্য লেখাপড়াও শিখিয়েছে। আর সবাইকেই ওর সাথে বা আশে পাশেই রেখেছে। ছেলে মেয়েদের কাউকেই কোন কারণেই দূরে পাঠায়নি।

ছেলেমেয়েদের দূরে পাঠানোর ঘোর বিরোধী সদানন্দ।

-স্যার রামদয়ালের বউটা দরকার না হলেতো আসে না। এবারেও আসতো না ওদের চেয়ারম্যান জোর করে পাঠিয়েছে। হয় রামদয়ালকে এ জায়গা ছেড়ে ফিরে যেতে হবে ঐ জংগলে। নয়তো বউটাকে তালাক দিতে হবে।

একটু থেমে সদানন্দ আবার বললো – ওতো ওখানকার কিচ্ছু চেনে না, কাউকে জানে না। ঐ জংগলে আলো নেই রাস্তাঘাট নেই চোর ডাকাত আর মশা মাছিতে ভরা, ওখানে গিয়ে ও কি বাচতে পারবে?

জোরে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে সদানন্দ আবার বললো – আর বউটাকেই বা কি করে তালাক দেবে। ও ঘরে যে ওর ছেলে মেয়ে আছে। একত্রে যে থাকতে পারে না এটা কি ওর দোষ?

বুঝলাম রামদয়াল আর সদানন্দ সমস্যা সমাধানের জন্য আগে থেকেই আলাপ আলোচনা করে একত্রেই এসেছে।

আকাশ যেন ফুটো হয়ে বৃষ্টি পড়ছে। বন্যার পানি আশে পাশে মাঠ আর প্রান্তরে ঢুকে মাঠ ঘর বাড়ী সব একাকার হয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতির এই নির্মমতায় সবাই জর্জরিত হচ্ছে। কিন্তু নিরুপায়ের মত হাহাকার করা ছাড়া মানুষ কোন পথ খুজে পাচ্ছে না।

-স্যার আমেরিকা থেকে এক ইংরেজ মেম সাহেব টেলিফোনে আপনার নাম বলছে।

বৃদ্ধ বয়সী কাজের লোকটার কথায় চমকে উঠলো চৌধুরী সাহেব।

ক্রিস্টিন ওর নাম। আমেরিকাতে কাজের পারমিট আর রেসিডেন্সি ভিসা পাওয়ার সহজ উপায় হিসাবে ক্রিস্টিনের সাথে চৌধুরীর কনট্রাক্ট ম্যারেজ হয়। ক্রিস্টিন আসলে অন্য যারা কনট্রাক্ট ম্যারেজ করে তাদের থেকে ভিন্ন। মুলতঃ টাকা পয়সার জন্য ক্রিস্টিন ওকে বিয়ে করে, তখন ওর পড়াশোনা শেষ হতে আরো একবছর বাকি ছিল। তায় একটা নিশ্চিত আশ্রয় এবং কিছুটা টাকা পয়সার প্রয়োজন ছিল ক্রিস্টিনের।

ক্রিস্টিনের আন্তরিকতায় ওদের কণ্টাক্ট্রের সম্পর্ক ভাললাগা থেকে ভালবাসায় পরিণত হয়। ক্রিস্টিন বারংবার চৌধুরীকে অভয়দান করেছে যেন ভবিষ্যতের কোন দায়দায়ীত্বের চিন্তা কোনক্রমেই ওদের মনের চাওয়া পাওয়াকে প্রভাবিত না করে। ক্রিস্টিন বলেছিল সে কখনো চৌধুরীর জন্য বোঝা বা কোন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে না।

ওদের ভালবাসার ফসল হিসাবে জন্ম নেয় একটি ফুটফুটে মেয়ে।

ওদেশ ছেড়ে চলে আসার সময় মেয়েটা চার বছরে পা দিয়েছিল। বাবাকে হারানোর ব্যাথাটা বোঝার মত বয়স ওর হয়নি তখনো।

ওদেশ ছেড়ে আসবার সময় ক্রিস্টিন বারবার চৌধুরীকে আশ্বাস দিয়েছে – আমি এখন চাকরী করছি। এদেশে বাবা বা স্বামী ছাড়া জীবন চালানো কোন সমস্যা নয়। তুমি আমাদেরকে নিয়ে কোন চিন্তা করোনা। আমরা তোমারই থাকবো। আর তোমার মেয়েতো ওদেশে যেয়ে বসবাস করতে পারবে না। তুমি যাও, কোন প্রয়োজন হলে জানাবো।

এ বৃষ্টি বোধহয় থামার নয়। নদীর দুধার উপচে জল আশেপাশের গ্রামে ঢুকছে। গ্রাম আর নদী মিলে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে।

গ্রামের মানুষ গুলোর বসবাস এখানেই। অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গাও ওদের নেই বা যাওয়ার বাসনাও মনে নেই। অন্য কোথাও কি হচ্ছে বা হবে তা নিয়ে কোন উদ্বিগ্নতাও নেই। তায় এখানকার প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে জীবন এগিয়ে নিতে ওরা অভ্যস্ত।

প্রথম চৌধুরীর দূরদর্শিতার বদৌলতে এই তিনটি বাড়ী উচু জায়গায় স্থাপিত হওয়াই এখনো টিকে আছে। কিন্তু জন বিচ্ছিন্ন হয়ে কতদিন টিকতে পারবে তা কেবল ভবিতব্যই জানে।

সদানন্দের আত্মীয় স্বজন সবাই এ অঞ্চলেই আশেপাশেই বসবাস করে। তারা নৌকায় করে এসে ওর খোজ খবর নিচ্ছে।

কি করবে বর্তমান চৌধুরী এখন। কি বলবে ও ক্রিস্টিনকে। আর কি বা পরামর্শ দেবে রামদয়ালকে। সেও যে ওর মত দ্বীপবাসী।

Category: Bangla, Short Story

Comment List

Your email address will not be published.