দৈবক্রম- ১

দৈবক্রম

                                                                                                                                                                                                                                          meherhossain1752@gmail.com

 

ভাগ্যিস ট্রেনটা সেদিন একটু লেট করে আসলো। তায়তো দেরীতে ষ্টেশানে পৌছেও দৌড়াতে দৌড়াতে এসে একদম শেষ মুহুর্তে চলন্ত ট্রেনের একটা কামরায় উঠে এলো পরশ। আরেকটু হলেই মিস করতো ট্রেনটা। মিস করলে কি হত কে জানে!

মামার বাড়ীর ধারে কাছেই একটা ষ্টেশান আছে। তবে দূরপাল্লার এক্সপ্রেস ট্রেন থামেনা ওখানে। তায়তো ট্রেনটা ধরার জন্য সেই কাক ডাকা ভোরে উঠে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার পথ জার্নি করে এই মেইন ষ্টেশানটাতে এসেছে পরশ।

লম্বা ছুটির পর আজ সন্ধ্যার মধ্যেই হোষ্টেলে পৌছাতে হবে। কাল থেকে ক্লাস শুরু।

হাতে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে মামার প্রাইভেট কারে শেষ রাতে রওয়ানা দিলেছিল ট্রেনটা ধরার জন্য। বেশ খোশ মেজাজেই ছিল ও। মামা বাড়ীতে প্রায় পনের দিন ছুটি কাটিয়ে সুখ স্মৃতি গুলো রোমন্থন করতে করতে ফিরছিলো। শুকতারাটা তখনো পুব আকাশে জ্বল জ্বল করছিলো।

ভাগ্যের কি পরিহাস! মাঝপথে গাড়ীটা হটাৎ করেই বিগড়ে বসলো। ড্রাইভারের কাচুমুচু অবস্থা দেখে কোন কিছুই বলেনি ওকে পরশ।

মাঝবয়সী ড্রাইভার গাড়ীটা ঠিক করার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টায় রত।

অনন্যপায় পরশ অসহায়ের মত রাস্তার পাশে একটা উচু ঘাসের ঢিবির উপর বসলো। একেতো ছুটির দিন, তার উপর অত ভোর। ও সময় অন্য কোন গাড়ী ঘোড়াও পাওয়া যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীন। কলেজে ফেরার চিন্তা বলতে গেলে একরকম ছেড়েই দিয়েছিল।

ট্রেনতো নির্ঘাত মিস হবে। লেট হলেও কলেজ পর্যন্ততো যেতে হবে। কিন্তু ওই কয়েকশো কিলোমিটার রাস্তা যাবে কি ভাবে। সেটাই ভাবছিল পরশ।

 

-গত কয়েকদিন মামার এই গাড়ী করেই কত জায়গা ঘুরে বেড়িয়েছে কোথাও এতটুকু সমস্যা হয়নি, অথচ এখন দরকারের সময়- একেই বলে কপাল।

 

ইণ্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেবে পরশ। এবারের ছুটিটা ফাইনাল পরীক্ষার আগে শেষ ছুটি। এক মাস ছুটির প্রথম ভাগটা নিজ বাড়ীতে কাটিয়ে শেষ ভাগটা কাটিয়েছে মামা বাড়ীতে।

মামা বাড়ী ছুটি কাটানোর আলাদা একটা মজা আছে। ওর মা তিন ভায়ের একমাত্র বোন। তাছাড়া নানা নানি বেচে আছে। যৌথ পরিবারে অনেক মানুষ বিভিন্ন বয়সের। মামা বাড়ীর আনন্দটায় আলাদা অনেকদিন লেপটে থাকে স্মৃতিতে।

পরশের বাবা আকবর জোয়ারদারের ইচ্ছে ছেলে বড় হয়ে ডাক্তার হবে। অনেক লেখাপড়া শিখে বড় ডাক্তার হবে পরশ। তবে চাকরী করবে না। জোয়ারদার এষ্টেটের মধ্যে ওর পরদাদুর আমল থেকে  যে হাসপাতালটা আছে ডাক্তার হয়ে ওই হাসপাতালেই কাজ করবে আর অঞ্চলের সব মানুষদের সেবা করবে পরশ। ওটার কলেবর আরো বৃদ্ধি করে দাদুর স্বপ্নকে জীবিত রাখবে পরশ।

জোয়ারদার বংশকে বাচিয়ে রাখার জন্য পরশই একমাত্র আশা। পরশ ওদের সংসারে আসলো ওরা যখন সন্তানের আশা বলতে গেলে ছেড়েই দিয়েছিল।

পরশের মা রাজিয়া বেগম সবসময় বলেন যে জোয়ারদার এষ্টেটের মাটি আর গাছপালার সাথে পরশের অন্য রকম একটা সম্পর্ক আছে। যেমনটি মায়ের সাথে সন্তানের সম্পর্ক। পরশ যেন কোনদিন কোন কারণেই জোয়ারদার এষ্টেট ছেড়ে অন্য কোথাও না যায় সে অনুরোধটা জ্ঞান হওয়া অব্দি মায়ের মুখ থেকে শুনে আসছে পরশ।

-গেলে তোমাকেও সঙ্গে নিয়ে যাব।

মায়ের অনুরোধের প্রেক্ষিতে পরশের ওমন হালকা মন্তব্যেও খুব গম্ভীর হয়ে যেতেন রাজিয়া বেগম।

-আমাকে নিয়ে যাওয়া না যাওয়া কোন বিষয় না, তুই জোয়ারদার এষ্টেট ছেড়ে কোথাও যাবি না এটাই আমার শেষ কথা।

ছেলেকে কথাগুলো বলতে বলতে রাজিয়া বেগম সব সময় আবেগ আপ্লুত হয়ে চোখ দুটো অশ্রুসজল হয়ে উঠতো।

 

হটাৎ করেই নির্জনতার বুক চিরে ঘট ঘট শব্দে আসা একটা স্কুটার ওর সম্বিত ফিরিয়ে দিল। তাকালো সে দিকে পরশ। আগত স্কুটারটা বেশ একটু দূরে তখনো। ওর সাথে আসা মামা বাড়ীর চাকরটা ওটাকে থামানোর জন্য রাস্তার উপর যেয়ে দাড়িয়েছে।

বিশের উপর বয়স হবে ছেলেটার, নাম করিম খিসা। ওর বাবা এংলিয়ানা খিসা ছিল পাহাড়ের বাসিন্দা। পরশের নানা পাহাড়ে বেড়াতে যেয়ে এক রেষ্টহাউজে এংলিয়ানার সাথে পরিচয়।

ফরেষ্ট ডিপার্টমেণ্টের রেষ্টহাউজ, ওখানেই কাজ করতো এংলিয়ানা । অল্প লেখাপড়া জানতো, ভাল বাংলা পড়তে পারতো। খবরের কাগজের এপিট ওপিট পড়ে বড় বড় বাড়ী গাড়ী রাস্তা ইত্যাদির দিকে গভীর ভাবে তাকিয়ে থাকতো এংলিয়ানা ।

নানার সাথে একটু খোলামেলা হওয়ার পর ওই নানাকে বলেছিল যে পাহাড়ী জীবন ওর একদম ভালো লাগে না। দম বন্দ হয়ে আসে এখানে। ও ছবির ওই শহরে সমতল ভূমিতে যেতে চায়।

আপন বলতে তেমন কেউ ছিল না ওর। মা মারা গিয়েছিল সেই ছোট বয়সেই। বাবা আরেকটা বিয়ে করে নতুন সংসার পেতেছিল।

এংলিয়ানাকে সঙ্গে করে এনেছিল ওর নানা, ভাল না লাগলে আবার ফেরত পাঠাবে বলে। কিন্তু আর গেল না ও, থেকে গেল ও বাড়ীতে।

নানাদের বাড়ীর কিছু অতি উৎশাহী মানুষ ওকে মুসলমান বানিয়ে একটা মুসলমান মেয়ের সাথে বিয়ে দিল। নানা নিজের ভিটার এক পাশে এক টুকরো জমিতে একটা ঘর করে দিল ওদের জন্য।

নিজের বলতে যা ছিল তার সব কিছু ছেড়ে স্বপ্নের ভূবনে ডুব দিয়ে দিন গুলো কাটিয়ে অকালেই চলে গেল এংলিয়ানা । রেখে গেল একমাএ সন্তান করিম খিসাকে।

এংলিয়ানা ওর সবকিছুকে পরিবর্তন করতে চায়লেও প্রকৃতি বোধহয় তাতে সাঈ দিল না। ছেলেটা গায়ের রংটা মায়ের কাছ থেকে নিলেও অন্য সব কিছুই ওর গোড়ার সাথে সম্পৃক্ত। করিমের চেহারায় বলে দেয় ওর মূলটা এখানে নয় অন্য কোন খানে। আর বিধাতার তৈরী অতবড় একটা ছিদ্র সমাজের ছিদ্রান্বেষী মানুষের দৃষ্টি থেকে কি রক্ষা পায়?

তায়তো করিম খিসা হাফিয়ে উঠেছে। ঠিক করেছে এ সব কিছু ছেড়ে ও ফিরে যাবে ওর উৎপত্তির কাছে।

বিধাতার চাওয়া কি কখনো খণ্ডানো যায়! সে যেটা চায় তা সে করেই ছাড়ে। তায়তো বিধির বিধান কেবল মেনে নিলেই সমস্যার সমাধান হয়।

একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে একদিন করিম নানাকে বললো যে ও বাবার দেয়া নাম পরিবর্তন করে করম খিসা রাখবে। আর মায়ের একটা ব্যবস্থা করেই ফিরে যাবে ও পাহাড়ে। চিরদিনের জন্য।

 

স্কুটারের যে গতি তাতে ট্রেনটা ধরা আসম্ভব। কিন্তু পরশের অনিচ্ছা সত্বেও করিম মালপত্রগুলো টেনে হেচড়ে স্কুটারে উঠিয়ে বললো- দেখ বিধি কি চায়!

 

ট্রেনটা ছাড়ার ঠিক আগ মুহুর্তে কোনমতে ষ্টেশানে পৌছালো ওরা। টিকিট দেখে সঠিক কামরায় উঠার সময় ছিল না হাতে। অগত্যা সামনে পাওয়া কামরাটাতে কোন রকমে সুটকেস আর হ্যাণ্ড ব্যগটা করিম খিসা ঠেলে উঠিয়ে দিতে দিতেই পরশ লাফ দিয়ে উঠলো চলন্ত ট্রেনে।

করিম খিসার বদৌলতে সেদিন চলন্ত ট্রেনের ওই কামরায় উঠেছিল পরশ।

 

প্রথম শ্রেণীর কামরা। কামরার ধার ঘেসে সরূ গলি পথ আর তার সাথে লাগানো এক বা দুই সিটের কামরা। রিজার্ভ করা ওগুলো।

ওই সরূ গলি পথে পরশের সুটকেসটা অন্যান্য যাত্রিদের যাতায়াতে বিঘ্ন সৃষ্টি করায় সেটা টেনে কোথাও সরানোর সিদ্ধান্ত নিল পরশ।

কিন্তু রাখবে কোথায় ওটা!

মধ্য বয়ষ্ক এক কাপল ওদের রিজার্ভ করা কামরাটা খুজছে। তাদের যাওয়ার রাস্তা করে দেয়ার জন্য পরশ হাতের ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে ভারী সুটকেসটা ঠেলে পাশের রিজার্ভ করা কামরাটার আধা খোলা দরজা দিয়ে একটু ঠেলে ঢুকাতে চেষ্টা করলো।

-এইডা রেজাব করা কামরা।

আধা বয়সী ভারী শরীরের একজন মহিলা উকি দিয়ে মাখা বের করে বিরক্ত প্রকাশ করলো।

-ভুল হয়েছে খালামনি, এখানে একটুও থাকার একদম ইচ্ছে আমার নেই।

মহিলার দিকে একটু তাকিয়ে নিয়ে কাঁধে ঝুলানো ব্যাগটা সামলাতে সামলাতে পরশ ওকে কিছুটা অগ্রাহ্য করেই কথাটা বলে কামরার ভিতর ঠেলে ঢুকালো সুটকেসটা।

-দৈবক্রমে উঠেছি এ কামরায়। আমার টিকিট এখানকার নয় অন্য কামরার। মানুষের যাতায়াতের অসুবিধা হচ্ছে তায় অনোন্যপায় হয়ে কিছুটা সময়ের জন্য সুটকেসটা রাখছি এখানে। আমর ছিটটা খুজে দেখে একটু বাদেই এটা নিয়ে যাব।

মহিলার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলো পরশ। ওর অনুমতির অপেক্ষা না করেই সুটকেস আর হাতের ব্যগটা ওই কামরার ভিতরে রেখেই পরশ ওর সিঙ্গেল চেয়ারের সিটটা খুজতে বেরিয়ে গেল।

 

রিজার্ভ করা কামরাটা একজন তরূনীর, নাম ভাবনা সরকার।

ভাবনা রেসিডেনসিয়াল মহিলা কলেজ, হলি হোমস এ ইণ্টারমিডিয়েট ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী। ছুটি শেষে হোষ্টেলে ফিরছে।

গভীর রাতে ছাড়ে ট্রেনটা, তারপর সারা দিনের জার্নি। কোন কারণে রাস্তায় দেরী হলে গন্তব্যে পৌছাতে রাত হয়ে যায়। তায় ওর বাবা আরিফ সরকার মেয়েকে ছুটি শেষে যখই কলেজে পাঠায় তখন পুরো দুসিটের কামরা রিজার্ভ করে দেয়। যাতে কাজের মহিলা আর মালপত্র নিয়ে মেয়েটা একটু স্বাচ্ছন্দে জার্নি করতে পারে।

মনটা ভাল নেই ভাবনার। লম্বা ছুটি কাটিয়ে কলেজে ফিরছে আজ।

একপাশে সিটে গাটা এলিয়ে দিয়ে একটা পত্রিকার মধ্যে মনোনিবেশ করার চেষ্টা করছে ও। পাশের সিটে মধ্যবয়সী কাজের মহিলা লাইলী।

অন্যান্য বারের মত এবারেও ওর বাবা নিজ হাতে মালপত্রগুলো উপরের বার্থে উঠিয়ে ঠিকঠাক করে দিয়েছে। লম্বা রাস্তা তায় সাথে পর্যাপ্ত পরিমান খাবার দাবারও দিয়েছে।

লাইলীর বাড়ীটা ওর কলেজের পাশে। তায় ভাবনার বাবা ওকে সাথে পাঠিয়েছে। মেয়েটাকে হোষ্টেলে পৌছে দিয়ে ও বাড়ীতে ঘুরে আসবে।

পরশ ওভাবে ব্যগটা রাখাতে লাইলী তখনও রাগে গজ গজ করছে।

পত্রিকার পাতা থেকে মুখ উঠিয়ে সুটকেসটার দিকে তাকালো ভাবনা। বেশ বড় করে পরশের নাম আর কলেজের ঠিকানা লেখা।

ওর একই ক্লাসে পড়ে। ওর কলেজটাও একই শহরে। আর নামটা কেমন যেন পরিচিত লাগছে। তখন ভালো করে ওকে দেখেনি। ফিরে আসলে ভালো করে দেখবে এবার।

ভাবলো ভাবনা।

 

Category: Bangla, Novel

Comment List

Your email address will not be published.